“আমার মৃত্যুর জন্য স্ত্রী-ই দায়ী!” হোয়াটসঅ্যাপে ভয়েস মেসেজ পাঠিয়েই ঘরে গলায় ফাঁস শান্তিপুরের রাজার, নেপথ্যে মারাত্মক দাম্পত্য কলহ

দাম্পত্য জীবনের তিক্ততা ও মানসিক যন্ত্রণা যে এভাবে আটাশ-উনত্রিশ বছরের একটি তরতাজা প্রাণ কাড়বে, তা ভাবতে পারেননি নদিয়ার শান্তিপুরের ঘোড়ালিয়া জলপরী এলাকার বাসিন্দারা। পেশায় জমিজমা ব্যবসায়ী ২৯ বছরের রাজা প্রামাণিকের রহস্যমৃত্যুতে গোটা এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র উত্তেজনা ও শোকের ছায়া।
বিদেশে পরিশ্রমের উপার্জিত টাকা স্ত্রীর অ্যাকাউন্টে, তবুও কমেনি দূরত্ব
পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, সাত বছর আগে শান্তিপুরের হবিবপুরের এক তরুণীর সঙ্গে সামাজিক নিয়ম মেনে বিয়ে হয় রাজার। তাঁদের একটি ছোট সন্তানও রয়েছে। বিয়ের পর সংসারের আর্থিক অনটন দূর করতে ভিন রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে যান রাজা।
রাজার পরিবারের দাবি—
- উপার্জনের সিংহভাগ টাকাই তিনি প্রতি মাসে স্ত্রীর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাঠাতেন।
- তা সত্ত্বেও স্ত্রী শ্বশুরবাড়িতে না থেকে বছরের বেশিরভাগ সময় বাপের বাড়িতেই কাটাতেন।
- রাজা বাড়ি ফিরলে স্বল্প সময়ের জন্য দেখা করে শুধু টাকা নিয়ে চলে যেতেন বলে অভিযোগ।
দাম্পত্যের এই দূরত্ব ঘোচাতে ভিন রাজ্য থেকে কাজ ছেড়ে শান্তিপুরে ফিরে আসেন রাজা। সঞ্চিত পুঁজি দিয়ে শুরু করেন জমিজমা বেচাকেনার ব্যবসা। কিন্তু তবুও স্ত্রীর সাথে সম্পর্কের কোনো উন্নতি হয়নি; স্ত্রী একসাথে সংসারও করতেন না, আবার আইনি বিচ্ছেদের পথেও হাঁটতেন না।
[ঘটনার সংক্ষিপ্ত সময়রেখা]
* ৭ বছর আগে: বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন রাজা প্রামাণিক ও হবিবপুরের তরুণী।
* বছরখানেক আগে: দাম্পত্য মেটাতে রাজ্য ফিরে ব্যবসা শুরু করেন রাজা।
* বৃহস্পতিবার সকাল: হোয়াটসঅ্যাপে তীব্র বাদানুবাদ ও ভয়েস মেসেজ চালাচালি।
* ঘটনার অন্তিম রূপ: স্ত্রীকে দায়ী করে ভয়েস মেসেজ এবং গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা।
বৃহস্পতির সকালে চড়ম বাদানুবাদ ও মৃত্যুর শেষ বার্তা
বৃহস্পতিবার সকালে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে হোয়াটসঅ্যাপে দীর্ঘ সময় ধরে কথাবার্তা ও ভয়েস মেসেজ আদানপ্রদান হয়। স্বজনদের অভিযোগ, সেই সময় অশান্তি চরম আকার ধারণ করে এবং স্ত্রী ফোনে রাজাকে আত্মহত্যার প্ররোচনা দেন।
অশান্তির মাত্রা এতটাই বাড়ে যে, রাজা একটি ভয়েস মেসেজ রেকর্ড করে পাঠান স্ত্রীকে, যেখানে তিনি স্পষ্টভাবে জানান—তার এই চরম সিদ্ধান্তের জন্য কেবল তাঁর স্ত্রী-ই দায়ী। এরপরই ঘরের দরজা বন্ধ করে গামছা দিয়ে গলায় ফাঁস লাগিয়ে ঝুল পড়ে যান তিনি।
তদন্তে শান্তিপুর থানার পুলিশ
পরিবারের সদস্যরা ঝুলন্ত অবস্থায় রাজাকে দেখতে পেয়ে দ্রুত খবর দেয় পুলিশকে। শান্তিপুর থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে রাজাকে উদ্ধার করে শান্তিপুর স্টেট জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।
পুলিশ ইতিমধ্যেই ঘটনায় ব্যবহৃত রাজাসমেত পরিবারের মোবাইল ফোনগুলি বাজেয়াপ্ত করেছে। মৃত্যুর সঠিক কারণ জানতে এবং প্ররোচনার অভিযোগে সত্যতা রয়েছে কি না তা দেখতে রাজার মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য রানাঘাট পুলিশ মর্গে পাঠানো হয়েছে।
এক নজরে ঘটনাটি:
| বিষয় | বিবরণ/তথ্য |
| মৃতের নাম ও বয়স | রাজা প্রামাণিক (২৯ বছর) |
| ঘটনাস্থল | ঘোড়ালিয়া জলপরী, বেলঘড়িয়া-২, শান্তিপুর, নদিয়া |
| মৃত্যুর ধরন | গলায় গামছার ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা |
| মূল অভিযোগ | স্ত্রীর বিরুদ্ধে মানসিক অত্যাচার ও আত্মহত্যায় প্ররোচনা |
| তদন্তকারী থানা | শান্তিপুর থানা (দেহ পাঠানো হয়েছে রানাঘাট মর্গে) |
স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীর ভূমিকা এবং হোয়াটসঅ্যাপের ভয়েস মেসেজই এখন এই মামলার অন্যতম প্রধান প্রমাণ। একটি সুন্দর পরিবারের এমন মর্মান্তিক পরিণতিতে শান্তিপুরে যেমন শোকের ছায়া নেমে এসেছে, তেমনই দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন রাজার পরিবার ও স্থানীয় প্রতিবেশীরা।






