৮০তম স্বাধীনতা দিবসে অবহেলার অন্ধকারেই কানাইপুরের ‘ত্রয়ী বৃক্ষ’, ১৯৪৭-এর ইতিহাস সংরক্ষণে উদ্যোগে বনদপ্তর

৮০তম স্বাধীনতা দিবসের (80th Independence Day) পুণ্যলগ্নে দেশজুড়ে যখন পতাকোত্তোলন ও নানা উৎসবে মেতেছেন আপামর ভারতবাসী, ঠিক তখনই হাওড়ার বাগনানের কানাইপুরে নিরবে, নিভৃতে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক জীবন্ত ইতিহাস। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট দেশের প্রথম স্বাধীনতা দিবসের দিনে রোপণ করা বট, অশ্বত্থ ও নিম গাছ— এই ‘ত্রয়ী বৃক্ষ’ আজ ৭৯ বছর অতিক্রান্ত করে মহীরুহে পরিণত হয়েছে। কিন্তু আফসোসের বিষয়, ঐতিহ্যের এই অমূল্য সাক্ষী আজ চরম প্রশাসনিক ও সামাজিক অবহেলার শিকার।
১৯৪৭ সালের স্বাধীনতার ভোর এবং ‘ত্রয়ী বৃক্ষ’ রোপণ
আজ থেকে ঠিক ৭৯ বছর আগে, ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত যখন পরাধীনতার শৃঙ্খল মুক্ত হয়ে নতুন ভোরের মুখ দেখেছিল, তখন কানাইপুরের তেমাথার মোড়ে একত্রিত হয়েছিলেন তৎকালীন স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।
ডাঃ সত্যচরণ চট্টোপাধ্যায়, বীরেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়, গোষ্ঠবিহারী বেরা, বিভূতি বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অম্বিকা রায়ের মতো স্বাধীনতা সংগ্রামী ও কংগ্রেস নেতারা স্বাধীনতার সেই চিরস্মরণীয় মুহূর্তকে ধরে রাখতে রোপণ করেছিলেন তিনটি চারা গাছ— বট, অশ্বত্থ এবং নিম।
[কানাইপুরের ত্রয়ী বৃক্ষ সংক্ষেপ]
* রোপণের তারিখ: ১৫ আগস্ট, ১৯৪৭ (প্রথম স্বাধীনতা দিবস)।
* উদ্যোগী ব্যক্তিত্ব: ডাঃ সত্যচরণ চট্টোপাধ্যায়, বীরেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়, গোষ্ঠবিহারী বেরা, বিভূতি বন্দ্যোপাধ্যায়, অম্বিকা রায়।
* বৃক্ষের ধরণ: বট (Banyan), অশ্বত্থ (Peepal) এবং নিম (Neem)।
* অবস্থান: কানাইপুর তেমাথার মোড়, বাগনান, হাওড়া।
অবহেলার চিত্র ও স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষোভ
দীর্ঘ সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনটি গাছ একসঙ্গে বেড়ে উঠে সুবিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে। কিন্তু ইতিহাস ধরে রাখা এই স্থানটি আজ চরম অবহেলিত।
- গাছের চারপাশের বাঁধানো বেদিটি ভাঙাচোরা এবং অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
- সামনের রাস্তাও জরাজীর্ণ।
- নিয়ম করে কোনো স্মৃতিতর্পণ বা রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না বললেই চলে।
- নতুন প্রজন্মের কাছে এই বৃক্ষত্রয়ীর ঐতিহাসিক গুরুত্বের কথা পৌঁছায়নি।
স্থানীয় সমাজসেবী মোহনলাল কাপড়ি বলেন, “আমরা ছোট থেকেই বড়দের মুখে শুনে আসছি এই তিন গাছ আমাদের স্বাধীনতার স্মারক। তাই এগুলোকে অতি দ্রুত ভালোভাবে সংরক্ষণ করা উচিত।”
একই সুর স্থানীয় সাহিত্যিক শুভেন্দু দত্তের গলায়। তিনি জানান, “এগুলো আমাদের পুরো এলাকার গৌরব। মহীরুহ ত্রয়ীর সম্মানার্থে এমনভাবে জায়গাটাকে গড়ে তোলা দরকার, যাতে এটি অঞ্চলের একটি অন্যতম আইডেন্টিটি বা পরিচিতি হয়ে দাঁড়ায়।”
প্রশাসনের আশ্বাস ও সংরক্ষণ পরিকল্পনা
বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে অবশেষে নড়েচড়ে বসেছে স্থানীয় প্রশাসন ও বনদপ্তর। হাওড়া বিভাগীয় বনদপ্তরের কর্তা সুজিত দাস জানিয়েছেন, এই ইতিহাস রক্ষা করতে শীঘ্রই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে ১২৫ দিনের কাজ (MGNREGA/গ্রামীণ কর্মসংস্থান) প্রকল্পের মাধ্যমে গাছের চারপাশের এলাকাটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে সৌন্দর্যায়ন ও সংরক্ষণের কাজ হাতে নেওয়া হবে। পাশাপাশি, ১৯৪৭ সালে যে সকল বরেণ্য ব্যক্তিত্ব এই চারাগুলি রোপণ করেছিলেন, তাঁদের নাম খোদাই করে একটি স্মারক ফলক (Memorial Plaque) তৈরি করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এক নজরে ঐতিহ্যের ‘ত্রয়ী বৃক্ষ’:
| বিষয় | তথ্য / বিবরণ |
| স্থান | কানাইপুর তেমাথার মোড়, বাগনান, হাওড়া |
| রোপণ কাল | ১৫ আগস্ট, ১৯৪৭ |
| গাছের ধরণ | বট, অশ্বত্থ ও নিম |
| প্রধান দাবি | বেদির সংস্কার, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা ও হেরিটেজ রূপদান |
| বনদপ্তরের পদক্ষেপ | ১২৫ দিনের কাজে এলাকা সংস্কার ও প্রতিষ্ঠাতাদের নামাঙ্কিত ফলক নির্মাণ |
ইট-কাঠ-পাথরের স্মৃতিসৌধের বাইরে এই ৩টি জীবন্ত বৃক্ষ কেবল প্রাকৃতির উপাদান নয়, এরা স্বাধীনতা সংগ্রামের আবেগ ও স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রভাতের প্রত্যক্ষদর্শী। ৮০তম স্বাধীনতা দিবসে দাঁড়িয়ে বাগনানের এই ঐতিহাসিক ‘ত্রয়ী বৃক্ষ’ যথাযথ মর্যাদা ও সংরক্ষণের আলো দেখুক— এমনটাই প্রত্যাশা এলাকার সর্বস্তরের মানুষের।






