বছরের শেষেই হওয়ার কথা ছিল বিয়ে! রংপুরে নৃশংস হত্যাকাণ্ডে হবু স্ত্রী ও তাঁর পরিবারকে হারিয়ে শোকে পাথর অদিত

রঙিন স্বপ্নের ইতি: শেষ ছবিতেই স্মৃতি অটুট
বছরের শেষেই সানাই বাজার কথা ছিল। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া অদিত কর এবং কারমাইকেল কলেজ থেকে ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা আগামী চক্রবর্তীর পরিবারে চলছিল বিয়ের প্রস্তুতি। কিন্তু শনিবারের কালরাত্রি সেই সমস্ত লাল-নীল স্বপ্নকে এক নিমেষে গুঁড়িয়ে দিল।
ঘটনার মাত্র দুই দিন আগে অর্থাৎ বুধবারেও দেখা হয়েছিল এই যুগলের। সেদিন আগামী অদিতকে বলেছিলেন, “আমরা তো কখনও কাপল পিক তুলিনি, চলো আজকে তুলি।” সেটিই যে হবু স্ত্রীর সাথে শেষ ছবি হবে, তা কল্পনাতীত ছিল অদিতের। সোশ্যাল মিডিয়ায় সেই ছবি শেয়ার করে অদিত লিখেছেন, “চিন্তা করো না আগামী, আমি তোমার সঙ্গে ছিলাম, আছি, থাকব।” কিছুদিন আগেই নিজের বাবাকে হারিয়েছিলেন অদিত; এবার অকালপ্রয়াত হবু স্ত্রীকে হারিয়ে তিনি মানসিকভাবে বিধ্বস্ত।
- বুধবার: শেষ দেখা ও ‘কাপল পিক’ তোলা
- বৃহস্পতিবার: ফোনে শেষ বার কথা হওয়া
- শনিবার: তালা ভেঙে ৪ জনের দেহ উদ্ধার
- রবিবার: পুলিশি তদন্তে মূল দুই অপরাধী গ্রেপ্তার
ঘটনার নেপথ্যে পুলিশি তদন্ত ও চাঞ্চল্যকর তথ্য
রংপুর নগরীর কামাল কাছনা মাছুয়াপাড়ার তালাবন্ধ বাড়ি থেকে একে একে চারজনের লাশ উদ্ধারের পর ঘটনার আসল রহস্য উন্মোচন করে পুলিশ প্রশাসন। রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ এক সাংবাদিক বৈঠকে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের বিশদ জানান।
| বিষয় | বিবরণ |
| নিহতদের পরিচয় | গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), প্রীতিলতা বালা (৫০), আগামী চক্রবর্তী (২৫) ও আয়ুষ চক্রবর্তী (১২)। |
| অভিযুক্তগণ | মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯)। |
| খুনের মূল কারণ | বাড়ির ছাদে উঠে মাদক সেবনে বাধা দেওয়া। |
| অপরাধের ধরন | ১. গামছা পেঁচিয়ে গণপতিবাবুকে শ্বাসরোধে হত্যা। ২. পরিচয় ফাঁস হওয়ার ভয়ে বাকি ৩ জনকে হত্যা। ৩. মৃতদের মুখে দাহ্য পদার্থ ঢেলে পোড়ানোর চেষ্টা। ৪. ঘটনা ডাকাতি দেখাতে ঘর এলোমেলো করা ও নাস্তা খাওয়া। |
ঠান্ডা মাথার খুন ও প্রমাণের অপচেষ্টা
পুলিশ জানায়, ছাদে বাধা দেওয়ায় প্রথমে গণপতি চক্রবর্তীকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। এরপর বাকি তিন সদস্য তাঁদের চিনে ফেলায় কাউকেই জ্যান্ত রাখা হয়নি। কাউকে সিঁড়িতে, কাউকে আবার খাটের তলায় ফেলে রাখা হয়।
নৃশংস এই কাণ্ড ঘটানোর পর অভিযুক্ত দুই যুবক কোনো অপরাধবোধ ছাড়াই বাড়ির বাথরুমে গিয়ে স্নান করে এবং ঘরে থাকা খেজুর ও শসা খায়। অপরাধ ঢাকা দিতে সমস্ত জিনিসপত্র এলোমেলো করে ডাকাতির রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি; পুলিশি তদন্তে ধরা পড়ে দুই অভিযুক্ত।
একটি নিরীহ পরিবারের চারটে তাজা প্রাণ এক নিমেষে শেষ হয়ে গেল কেবল মাদকাসক্তদের হিংস্রতায়। যে পরিবারে বিয়ের আলো জ্বলার কথা ছিল, সেখানে আজ শুধুই শ্মশানের নীরবতা। অদিত করের এই অপূরণীয় ক্ষতি এবং নৃশংস ঘটনার বিচারে সরব পুরো এলাকা।






