Uttam Kumar Birth Centenary: পুজোর মণ্ডপে মহানায়ক, উত্তম-নস্টালজিয়ায় সাজছে কলকাতা

‘তারে বলে দিও, সে যেন আসে না…’ হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কালজয়ী গান কানে বাজলেই বাঙালির মনে যে মুখটি ভেসে ওঠে, তিনি মহানায়ক উত্তম কুমার। জন্মশতবর্ষে সেই চিরকালীন রোম্যান্টিক নায়ক এবার ফিরছেন কলকাতার পুজোর মণ্ডপে। শুধু অভিনেতা উত্তম কুমার নন, তাঁর ব্যক্তিজীবন, অজানা গল্প, সিনেমার স্মৃতি এবং বাঙালির সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক—সব মিলিয়ে বালিগঞ্জ সমাজসেবীর মণ্ডপে তৈরি হতে চলেছে এক অন্যরকম শ্রদ্ধার্ঘ্য।
‘মহাপুজোয় মহানায়ক’, থিমে উত্তম-নস্টালজিয়া
‘জেন-জি’-র যুগেও বাঙালিয়ানার অন্যতম বড় আইকন উত্তম কুমার। তাঁর স্টাইল, হাসি, চাহনি, অভিনয় এবং রোম্যান্টিক ব্যক্তিত্ব আজও দর্শকদের কাছে সমান আকর্ষণীয়।
ষাট ও সত্তরের দশকে পুজোর সময় পায়ে হেঁটে বালিগঞ্জ সমাজসেবীর মণ্ডপে আসতেন উত্তম কুমার। মাতৃপ্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতেন, উপভোগ করতেন পুজোর আবহ। এবার সেই মণ্ডপেই জন্মশতবর্ষে মহানায়কের প্রত্যাবর্তন।
পুজো উদ্যোক্তাদের দাবি, এই আয়োজনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের সামনে উঠে আসবে প্রশ্ন—কেন এত বছর পরেও উত্তম কুমার সমান প্রাসঙ্গিক? কেন বাংলা সিনেমার রোম্যান্টিক নায়ক হিসেবে এখনও তাঁর জায়গা এতটা অটুট?
‘মানুষ উত্তম কুমার’-কে চেনার সুযোগ
এই পুজোর অন্যতম আকর্ষণ হবে পর্দার বাইরের উত্তম কুমার। তাঁর অভিনীত সিনেমার দৃশ্য, সংলাপ, গান এবং নানা অজানা-জানা ঘটনার পাশাপাশি তুলে ধরা হবে তাঁর ব্যক্তিত্বের বিভিন্ন দিক।
পুজো উদ্যোক্তাদের বক্তব্য, দর্শক মণ্ডপে এসে শুধু মহানায়ককে দেখবেন না, বরং অনুভব করবেন ‘মানুষ উত্তম কুমার’-কেও।
‘দৃষ্টিদান’ থেকে ‘সাড়ে চুয়াত্তর’
উত্তম কুমারের চলচ্চিত্রজীবনের শুরুটা কিন্তু মোটেই মসৃণ ছিল না। তাঁর প্রথম ছবি ‘দৃষ্টিদান’, যেখানে তিনি পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। এরপর একের পর এক কয়েকটি ছবি ব্যর্থ হয়।
সপ্তম ছবি ‘বসু পরিবার’ সাফল্য পেলেও আসল মোড় আসে ১৯৫৩ সালে। সুচিত্রা সেনের সঙ্গে তাঁর প্রথম ছবি ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ মুক্তি পাওয়ার পরই বাংলা সিনেমা পেয়ে যায় তার চিরকালীন রোম্যান্টিক জুটি।
এরপর উত্তম-সুচিত্রা জুটি হয়ে ওঠে বাঙালির আবেগের অন্যতম প্রতীক। রোম্যান্টিক নায়ক হিসেবে উত্তম কুমার যে আসন দখল করেছিলেন, এত বছর পরেও সেই জায়গা কেউ পুরোপুরি ছুঁতে পারেননি।
৪০-এর বেশি নায়িকার সঙ্গে অভিনয়
সুচিত্রা সেনের পাশাপাশি উত্তম কুমার আরও বহু নায়িকার সঙ্গে অভিনয় করেছেন। তাঁর অভিনীত ছবিতে বিভিন্ন সময়ে প্রায় ৪০ জন নায়িকা কাজ করেছেন।
সত্যজিৎ রায়ের কালজয়ী ছবি ‘নায়ক’-এ তাঁর বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন শর্মিলা ঠাকুর। উত্তম কুমারের অভিনয় ও ব্যক্তিত্বের মোহ আজও যে অটুট, বিভিন্ন সময়ে তা স্মরণ করেছেন তাঁর সহশিল্পীরা।
জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে মহানায়কের তিন নায়িকা সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, মাধবী মুখোপাধ্যায় এবং অপর্ণা সেন-কেও অনুষ্ঠানে বা মণ্ডপে দেখা যেতে পারে বলে উদ্যোক্তাদের তরফে আশা করা হচ্ছে।
‘নায়ক’ থেকে ‘সপ্তপদী’, থাকবে কালজয়ী সিনেমার স্মৃতি
‘মহাপুজোয় মহানায়ক’ থিমের মণ্ডপে উত্তম কুমারের একাধিক কালজয়ী ছবির স্মৃতি তুলে ধরা হবে।
‘নায়ক’, ‘সপ্তপদী’, ‘পথে হল দেরী’, ‘দুই পৃথিবী’, ‘শিল্পী’, ‘অগ্নীশ্বর’, ‘দেওয়া নেওয়া’, ‘বনপলাশীর পদাবলী’-সহ একাধিক ছবির হৃদয়স্পর্শী সংলাপ, গানের দৃশ্য এবং বিরল মুহূর্ত থাকবে মণ্ডপসজ্জায়।
উদ্যোক্তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, দর্শক যেন শুধু সিনেমার পোস্টার না দেখেন, বরং উত্তম কুমারের চলচ্চিত্রজগতের মধ্যে প্রবেশ করার অনুভূতি পান, সেইভাবেই গোটা মণ্ডপ সাজানো হচ্ছে।
২০৩ বাংলা ও ৯ হিন্দি ছবি
উত্তম কুমারের অভিনয়জীবনের ব্যাপ্তিও তুলে ধরা হবে এই মণ্ডপে। তাঁর অভিনীত ২০৩টি বাংলা এবং ৯টি হিন্দি ছবি মুক্তি পেয়েছিল বলে উদ্যোক্তাদের তরফে জানানো হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি ছবি ডবল ভার্সানে নির্মিত হয়েছিল।
এছাড়াও এমন বেশ কিছু ছবি রয়েছে যেখানে উত্তম কুমার অভিনয় করলেও নানা কারণে সেগুলি মুক্তি পায়নি। তাঁর দীর্ঘ চলচ্চিত্রজীবনের জানা-অজানা বিভিন্ন অধ্যায়ও এই থিমে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে।
মণ্ডপজুড়ে সিনেমার পোস্টার, পুরনো দিনের ক্যালিগ্রাফি
মণ্ডপের দেওয়ালে দেখা যাবে উত্তম কুমারের বিভিন্ন ছবির পোস্টার। শুধু পোস্টার নয়, সেই সময়কার হরফ ও ক্যালিগ্রাফির ধাঁচও হুবহু তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে।
গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজের শিল্পীরা মণ্ডপে এই শিল্পকর্ম ফুটিয়ে তুলছেন। ফলে গোটা আয়োজনেই থাকবে পুরনো কলকাতা ও বাংলা সিনেমার নস্টালজিয়ার ছোঁয়া।
গিলে করা পাঞ্জাবি, ঢাকাই পাড়ের ধুতি
উত্তম কুমারের জনপ্রিয় পোশাক-পরিচ্ছদও বাদ যাচ্ছে না। পুজোর কয়েক দিন মণ্ডপে আসা দর্শকদের স্বাগত জানাবেন পুজো কমিটির সদস্যরা মহানায়কের জনপ্রিয় স্টাইলের পোশাকে—গিলে করা পাঞ্জাবি ও ঢাকাই পাড়ের ধুতি পরে।
মহানায়কের প্রিয় ফরাসের আদলেও বসার ব্যবস্থা থাকবে। অর্থাৎ মণ্ডপে প্রবেশ করলেই দর্শকদের সামনে ফুটে উঠবে উত্তম কুমারের সময়ের এক টুকরো কলকাতা।
জন্মশতবর্ষে বিশেষ অডিও-ভিসুয়াল
উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে বালিগঞ্জ সমাজসেবীর একাধিক কর্মসূচি রয়েছে। তার অন্যতম আকর্ষণ তাঁর জীবনের উপর নির্মিত একটি বিশেষ অডিও-ভিসুয়াল প্রকাশ।
থিমের কাজ শুরু হয়েছিল গত বছরের নভেম্বর থেকেই। মহানায়কের সঙ্গে ক্যামেরার সামনে ও পিছনে কাজ করা বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের তথ্য ও স্মৃতি সংগ্রহের পাশাপাশি তাঁর পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতাও নেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে এবারের পুজোয় বালিগঞ্জ সমাজসেবীর মণ্ডপ হয়ে উঠতে চলেছে উত্তম-নস্টালজিয়ার এক বিশাল ক্যানভাস। জন্মশতবর্ষে ফের যেন পর্দার বাইরে, পুজোর কলকাতায় ফিরে আসছেন বাঙালির সেই চিরন্তন মহানায়ক।






