Satya Niketan Building Collapse: অনুমোদন ছাড়াই ৫ তলা, ৭৫ ছাত্রের PG, উঠছে একাধিক প্রশ্ন

নয়াদিল্লির সত্য নিকেতন এলাকায় ছয়তলা বাড়ি ভেঙে পড়ার ঘটনায় সামনে আসছে একের পর এক নিয়মভঙ্গের অভিযোগ। প্রাথমিকভাবে জরাজীর্ণ বাড়ির দুর্বল কাঠামোকেই দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ মনে করা হলেও, এখন তদন্তের কেন্দ্রে রয়েছে অনুমোদন ছাড়া অতিরিক্ত তলা নির্মাণ, পুরনো বাড়িকে PG হিসেবে ব্যবহার এবং নির্মাণকাজ চলাকালীন ছাত্রদের সেখানে রাখার মতো একাধিক বিষয়।
রবিবার দুপুর দেড়টা নাগাদ দিল্লির চাণক্যপুরীর কাছে মোতিবাগ এলাকার সত্য নিকেতনে ওই বাড়িটি হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে। ঘটনায় এখনও পর্যন্ত ছয় জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও অনেকে আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের কাছে বাড়িটি ‘Hostel Daze’ নামে পরিচিত ছিল। তাঁদের দাবি, প্রায় ৫০ বছরের পুরনো বাড়িটি দীর্ঘদিন ধরেই জরাজীর্ণ অবস্থায় ছিল। কয়েক মাস আগে সেটিকে PG হিসেবে ভাড়া দেওয়া শুরু হয়। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি হওয়ায় এই এলাকায় পড়ুয়াদের থাকার চাহিদা বেশি। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়েই বাড়িটিকে PG-তে পরিণত করা হয়েছিল বলে অভিযোগ।
সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাড়িটির মালিক হরিরাম বনসল। গত কয়েক মাস ধরে তিনি বাড়িটির সংস্কার ও পরিবর্তনের কাজ করাচ্ছিলেন বলে জানা গিয়েছে। চলতি বছরের অগস্টেই সেখানে ছাত্রদের থাকতে দেওয়া হয়। কিন্তু তখনও নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ হয়নি বলে অভিযোগ। এমনকি বাড়ি ভেঙে পড়ার সময়ও বেসমেন্টে শ্রমিকরা কাজ করছিলেন বলে দাবি স্থানীয়দের।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে বাড়িটির অনুমোদিত উচ্চতা নিয়ে। MCD-র প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ওই এলাকায় সর্বোচ্চ গ্রাউন্ড প্লাস এক তলা নির্মাণের অনুমতি ছিল। অথচ দুর্ঘটনাগ্রস্ত বাড়িটি ছিল গ্রাউন্ড প্লাস পাঁচ তলা। অর্থাৎ অনুমোদিত সীমার বাইরে একাধিক অতিরিক্ত তলা নির্মাণ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ। MCD ইতিমধ্যেই বাড়িটিকে নির্মাণবিধি লঙ্ঘন করে তৈরি হওয়া কাঠামো হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
এর পাশাপাশি বেসমেন্টে নির্মাণ বা সংস্কারের কাজ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। দুর্ঘটনার সময় সেখানে শ্রমিকরা কাজ করছিলেন বলে অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে বেসমেন্টে জল জমে গিয়েছিল। সেই অবস্থাতেও কাজ চলছিল। তদন্তকারীরা এখন খতিয়ে দেখছেন, বেসমেন্টে অনুমোদনহীন খনন বা কাঠামোগত পরিবর্তন করা হয়েছিল কি না। সেই পরিবর্তনের ফলে বাড়িটির ভিত বা স্তম্ভের উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
স্থানীয় এক প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি, বাড়িটির বেসমেন্ট তৈরি এবং নিচের তলায় ভাড়ার জন্য জায়গা তৈরির কাজ চলছিল। তাঁর অভিযোগ, উপরের অংশ শক্ত করার কাজ হলেও নিচের স্তম্ভগুলি দুর্বল ছিল। যদিও এসব দাবির সত্যতা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত নয়।
আরও একটি বিষয় সামনে এসেছে—বাড়িটিতে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা। মূলত বসবাসের জন্য তৈরি বাড়িটিকে PG বা হস্টেলে পরিণত করা হয়েছিল। সেখানে প্রায় ৩০টি ঘর ছিল বলে জানা গিয়েছে। ঘরপিছু দুই থেকে তিন জন ছাত্র রাখার পরিকল্পনা ছিল। গোটা বাড়িতে ছাত্রদের জন্য প্রায় ৭৫টি খাট রাখা হয়েছিল বলেও জানা গিয়েছে।
একটি পুরনো ও জরাজীর্ণ কাঠামোর মধ্যে এত বেশি সংখ্যক মানুষের বসবাস ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সত্য নিকেতন এলাকায় এ ধরনের বাড়িকে PG বা হস্টেল হিসেবে ভাড়া দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। মালিকরা অনেক সময় অন্যত্র থাকেন, অনলাইনে ভাড়া নেন এবং নিয়মিত ভবনের রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এখানেই প্রশ্ন উঠছে প্রশাসনিক নজরদারি নিয়ে। প্রায় ৫০ বছরের পুরনো একটি বাড়িতে অতিরিক্ত তলা, নতুন নির্মাণকাজ এবং বিপুল সংখ্যক ছাত্রের বসবাস— এতগুলি বিষয় একসঙ্গে চললেও সংশ্লিষ্ট পুরসভা বা কর্তৃপক্ষের নজরে এল না কেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
MCD-র এক আধিকারিক জানিয়েছেন, বাড়িটির বিরুদ্ধে আগে কোনও অভিযোগের রেকর্ড ছিল না। তবে এখন তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, বাড়ির নির্মাণ বা সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না।
এদিকে ঘটনায় ইতিমধ্যেই আইনি পদক্ষেপ শুরু হয়েছে। সত্য নিকেতনের মেসবাড়ি ধসে পড়ার ঘটনায় বাড়ির মালিক হরিরাম এবং আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে সাউথ ক্যাম্পাস থানায় FIR দায়ের হয়েছে। অনিচ্ছাকৃত খুন, বাড়ি মেরামতে গাফিলতি এবং আবাসিকদের জীবন বিপন্ন করার অভিযোগে মামলা করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
দুর্ঘটনার পর বেআইনি নির্মাণের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে দিল্লি প্রশাসন ও MCD। চার তলার বেশি বেআইনি নির্মাণ দ্রুত সিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দায়িত্ব পালনে গাফিলতি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।
শুধু দুর্ঘটনাগ্রস্ত বাড়িই নয়, আশপাশের অন্যান্য PG নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পাশের একটি জরাজীর্ণ PG-ও খালি করে সিল করে দিয়েছে প্রশাসন। সেটি ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, দিল্লি পুরসভা ওই মেসবাড়ি খালি করার নোটিস দিয়েছে এবং তিন দিনের মধ্যে পুরো বাড়িটি ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মালিক নিজে বাড়ি না ভাঙলে পুরসভাই সেটি ভেঙে দেবে।
সত্য নিকেতন দুর্ঘটনার পর নড়েচড়ে বসেছে দিল্লি প্রশাসন। সোমবার সকালে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্ত জানিয়েছেন, জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য থাকা সব ধরনের ভবনের বার্ষিক স্ট্রাকচারাল অডিট বাধ্যতামূলক করার জন্য নিয়ম তৈরি করা হচ্ছে।
দিল্লি সরকার ও পুরসভা মিলে এই নীতি তৈরি করছে। PG অ্যাকোমোডেশন, নার্সিংহোম, স্কুল, হাসপাতাল-সহ সমস্ত পাবলিক বিল্ডিংয়ের কাঠামোগত নিরাপত্তা প্রতি বছর পরীক্ষা করতে হবে। নিয়মিত অডিট না হলে সংশ্লিষ্ট ভবনে কোনও কাজ করতে দেওয়া হবে না বলেও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
একই সঙ্গে ভেঙে পড়া মেসবাড়ি থেকে নিরাপদে বেরিয়ে আসা ছাত্রদের অন্যত্র থাকার ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
সত্য নিকেতনের এই ঘটনা এখন শুধু একটি ভবন ধসের তদন্তে সীমাবদ্ধ নেই। পুরনো বাড়িকে PG হিসেবে ব্যবহারের নিয়ম, অনুমোদন ছাড়া নির্মাণ, নির্মাণকাজ চলাকালীন ছাত্রদের বসবাস এবং প্রশাসনিক নজরদারি— সবকিছু নিয়েই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।






