‘সাগর মন্থন’ জলে নামল, সুনামির আগাম সতর্কবার্তা দেবে এই গবেষণা জাহাজ

সুনামি আসার আগেই উপকূলবাসীকে সতর্ক করবে ‘সাগর মন্থন’। সমুদ্রের গভীরে ভূমিকম্প এবং তার জেরে সুনামির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে কি না, তা আগাম শনাক্ত করার লক্ষ্যে তৈরি করা হয়েছে এই অত্যাধুনিক সমুদ্র গবেষণা জলযান বা ওসেন রিসার্চ ভেসেল (ORV)। বুধবার কলকাতার গার্ডেনরিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স (GRSE)-এর শিপইয়ার্ড থেকে জলে নামানো হল গবেষণামূলক এই বিশেষ জাহাজটি।
GRSE-র ঋষি বঙ্কিম শিপইয়ার্ডে গত পাঁচ মাস ধরে তৈরি হয়েছে ‘সাগর মন্থন’। প্রায় ৮৪০ কোটি টাকা মূল্যের এই গবেষণা জাহাজটি জল স্পর্শ করলেও এখনও সম্পূর্ণ প্রস্তুত নয়। গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি বসানো এবং জাহাজটির পূর্ণাঙ্গ কার্যক্ষমতা নিশ্চিত করতে আরও প্রায় দু’বছর সময় লাগতে পারে বলে জানা গিয়েছে।
জাহাজটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বার্তা দেন কেন্দ্রীয় ভূবিজ্ঞান মন্ত্রী ড. জিতেন্দ্র সিং। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ভূবিজ্ঞান মন্ত্রকের সচিব ড. শ্রীনিবাসকুমার তুম্মালা। তিনি জানান, অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি এই ORV উপকূলবর্তী এলাকা থেকে শুরু করে গভীর সমুদ্র পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের বৈজ্ঞানিক গবেষণা চালাতে সক্ষম হবে।
‘সাগর মন্থন’-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে সমুদ্রতলের ভূমিকম্প সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা এবং তার ভিত্তিতে সুনামির সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করা। জাহাজটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৬ কিলোমিটার গভীরতা পর্যন্ত গবেষণা চালাতে সক্ষম হবে। কোনও এলাকায় ভূমিকম্পের পর সুনামির সম্ভাবনা শনাক্ত হলে দ্রুত উপকূলবর্তী অঞ্চলকে সতর্ক করার ক্ষেত্রে এই গবেষণা কেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
৮৯.৫ মিটার লম্বা এবং ১৮.৮ মিটার চওড়া এই জাহাজটির ধারণক্ষমতাও উল্লেখযোগ্য। প্রায় ৫,৯০০ টন সামগ্রী বহন করতে পারবে ‘সাগর মন্থন’। দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থেকে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক অভিযান চালানোর উপযোগী করেই তৈরি করা হচ্ছে জাহাজটিকে।
কেন্দ্রীয় ভূবিজ্ঞান মন্ত্রী ড. জিতেন্দ্র সিং জানিয়েছেন, GRSE, কেন্দ্রীয় ভূবিজ্ঞান মন্ত্রক এবং ন্যাশনাল সেন্টার ফর পোলার অ্যান্ড ওসেন রিসার্চ (NCPOR)-এর সহযোগিতায় এই গবেষণা জাহাজ তৈরি হচ্ছে। গত কয়েক বছর ধরে কেন্দ্রীয় সরকারের ‘গভীর সমুদ্র মিশন’-এর অধীনে সমুদ্র গবেষণাকে আরও শক্তিশালী করার যে উদ্যোগ চলছে, তারই গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই প্রকল্প।
‘গভীর সমুদ্র মিশন’-এর আওতায় গভীর সমুদ্র প্রযুক্তি, ভারতের নিজস্ব মানববাহী সাবমার্সিবল, সমুদ্র ও জলবায়ু পরিষেবা, গভীর সমুদ্রের জীববৈচিত্র, সমুদ্র অনুসন্ধান, সমুদ্র থেকে শক্তি ও মিষ্টি জল আহরণ এবং উন্নত সামুদ্রিক জীববিজ্ঞান গবেষণার মতো একাধিক ক্ষেত্র রয়েছে।
‘সাগর মন্থন’ শুধু সুনামি সতর্কতার ক্ষেত্রেই নয়, সমুদ্রের তলদেশ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহেও কাজ করবে। জাহাজটিতে সমুদ্রতলের মানচিত্র তৈরি করার জন্য অত্যাধুনিক প্রযুক্তি থাকবে। পাশাপাশি সমুদ্রতলের পলি এবং খনিজ সম্পদের অনুসন্ধানের জন্যও বিশেষ গবেষণা ব্যবস্থা থাকবে।
জলের নীচে গবেষণার জন্য দূরনিয়ন্ত্রিত যান বা Remotely Operated Vehicle (ROV) এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলাচলকারী আন্ডারওয়াটার ভেহিকল নামানো ও ফের জাহাজে তুলে আনার জন্য বিশেষ পরিকাঠামোও থাকছে। এর ফলে সমুদ্রের এমন গভীর অংশেও গবেষণা চালানো সম্ভব হবে, যেখানে মানুষের সরাসরি পৌঁছনো অত্যন্ত কঠিন।
বিজ্ঞানী ও গবেষকদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সমুদ্র অভিযান চালানোর ক্ষেত্রেও এই জাহাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সমুদ্রের ভূপ্রকৃতি, খনিজ সম্পদ, জীববৈচিত্র এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হবে।
কেন্দ্রের বক্তব্য, এই গবেষণা জাহাজ ভারতের নিজস্ব জাহাজ নির্মাণ, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং বৈজ্ঞানিক সক্ষমতার ক্রমবর্ধমান শক্তির প্রতীক। দেশীয় প্রযুক্তি ও গবেষণার সমন্বয়ে তৈরি এই ধরনের জাহাজ ভবিষ্যতে ভারতের সমুদ্রবিজ্ঞান গবেষণাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।
‘সাগর মন্থন’-এর সাফল্য শুধু কতগুলি অভিযান পরিচালিত হল বা কতটা তথ্য সংগ্রহ করা গেল, তা দিয়ে বিচার করা হবে না। নতুন আবিষ্কার, নতুন প্রযুক্তির উন্নয়ন, তরুণ গবেষকদের উৎসাহিত করা এবং সমুদ্র গবেষণার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কীভাবে উপকার হচ্ছে—এসবের ভিত্তিতেই এই প্রকল্পের সাফল্য নির্ধারিত হবে।
সব মিলিয়ে, জলে নামার সঙ্গে সঙ্গেই ‘সাগর মন্থন’ ভারতের গভীর সমুদ্র গবেষণায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল। তবে পুরোপুরি গবেষণার কাজে নামতে এখনও অপেক্ষা করতে হবে। যন্ত্রপাতি সংযোজন ও চূড়ান্ত প্রস্তুতি শেষ হলে এই ভাসমান গবেষণাকেন্দ্রই ভবিষ্যতে সমুদ্রের গভীর থেকে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক তথ্য তুলে আনতে এবং সম্ভাব্য সুনামির আগাম সতর্কতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।






