“ইউক্রেন যা করেছে পার পাবে না!” কাস্পিয়ান সাগরে জাহাজে প্রাণঘাতী হামলার পর কিয়েভকে কড়া হুঙ্কার ইরানের, নেপথ্যে ইজরায়েলি ছক?

source : সংবাদ প্রতিদিন
ইরান ও ইউক্রেন— রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের জেরে দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন ছিল এতদিন কেবল পরোক্ষ ও কূটনৈতিক স্তরে। কিন্তু কাস্পিয়ান সাগরে ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজে ইউক্রেনের সরাসরি হামলায় নতুন করে যুদ্ধের আঁচ ছড়িয়ে পড়ল। আন্তর্জাতিক জলসীমায় এই প্রাণঘাতী হামলার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ইউক্রেনকে চরম মাশুল গুনতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান।
কাস্পিয়ান সাগরে বিস্ফোরণ, ইস্তফা থেকে সরব ইজরায়েল যোগের অভিযোগ
রাশিয়ার আস্ত্রাখান অঞ্চল থেকে যাত্রা শুরু করা ওই বাণিজ্যিক জাহাজটিতে আচমকাই ড্রোন হামলা চালানো হয়, যার ফলে শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটে। জাহাজটির এক নাবিক ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান এবং বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হন।
ঘটনার পর সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স-এ (X) ক্ষোভ উগরে দেন ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘাচি। তিনি স্পষ্ট অভিযোগ তোলেন, এই হামলা স্বাধীনভাবে চালানি ইউক্রেন; বরং ইজরায়েলের উসকানিতে এবং ইউরোপকে এই যুদ্ধে টেনে আনার উদ্দেশ্যেই ভোলোদিমির জেলেনস্কির প্রশাসন এই পদক্ষেপ নিয়েছে।
[কাস্পিয়ান সাগর হামলার বিবরণ]
* স্থান: কাস্পিয়ান সাগর (আস্ত্রাখান অঞ্চলের কাছাকাছি)।
* ক্ষয়ক্ষতি: ১ জন ইরানি নাবিকের মৃত্যু, একাধিক আহত।
* তেহরানের দাবি: সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক জাহাজ ও রাষ্ট্রসংঘ সনদের ধারা ২(৪) লঙ্ঘন।
* কিয়েভের দাবি: রাশিয়ায় অস্ত্র সরবরাহকারী জাহাজ ও সামরিক উদ্দেশ্য সাধনে ব্যবহৃত।
ইউক্রেনীয় রাষ্ট্রদূতকে তলব, কালাস ও লাভরভের সঙ্গে আলোচনা
ঘটনার পর দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে তেহরানে কর্মরত ইউক্রেনের রাষ্ট্রদূতকে বিদেশ মন্ত্রকে তলব করে কড়া কূটনৈতিক প্রতিবাদপত্র হস্তান্তর করে ইরান। ইরানি বিদেশ মন্ত্রকের তরফে সাফ জানানো হয়েছে, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতে তারা সরাসরি কোনো পক্ষ নয়, ফলে তেহরানকে লক্ষ্যবস্তু করা আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন।
ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘাচি দ্রুত টেলিফোনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিদেশ নীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কালাস (Kaja Kallas) এবং রাশিয়ার বিদেশমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ (Sergei Lavrov)-এর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। আরাঘাচি কালাসকে জানান, “কিয়েভ যে অপরাধ করেছে, তা কোনোভাবেই বিনা জবাবে ছেড়ে দেওয়া হবে না।”
অন্যদিকে, রাশিয়ার বিদেশ মন্ত্রক এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছে যে, সের্গেই লাভরভ এই ঘটনায় ইরানের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেছেন এবং কাস্পিয়ান অঞ্চলে সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে একযোগে কাজ করার বার্তা দিয়েছেন।
অস্ত্রের জোগান বনাম মধ্যপ্রাচ্যের টানাপোড়েন
হামলার কথা স্বীকার করে ইজরায়েলে নিযুক্ত ইউক্রেনীয় প্রতিনিধি এবং প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি জানান, কাস্পিয়ান সাগরে রাশিয়ার সামরিক পণ্য ও অস্ত্র পরিবহণে ব্যবহৃত জাহাজগুলির ওপর দূরপাল্লার নিখুঁত আঘাত হানা হয়েছে। ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইরান রাশিয়াকে ড্রোন ও সামরিক সহায়তা দিচ্ছে বলে কিয়েভ ও পশ্চিমী দেশগুলি অভিযোগ করে আসছিল।
তবে অতি সম্প্রতি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন-ইজরায়েল যৌথ হামলা এবং পরবর্তীতে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হওয়া ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির পর কাস্পিয়ান সাগরে এই রক্তক্ষয়ী ঘটনা দুই সংঘাতক্ষেত্রকে (ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্য) একসূত্রে বেঁধে দিল বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা।
এক নজরে কূটনৈতিক ও সামরিক প্রতিক্রিয়া:
| দেশ / সংস্থা | প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান ও মন্তব্য |
| ইরান | “ইউক্রেনের এই জলদস্যুতা ইজরায়েলের ইন্ধনে হয়েছে, কঠিন জবাব দেওয়া হবে।” |
| ইউক্রেন | “রাশিয়ার সামরিক রসদ যোগানো জাহাজেই হামলা চালানো হয়েছে।” |
| রাশিয়া | নাবিকদের মৃত্যুতে গভীর শোকপ্রকাশ ও ইরানের সাথে একাত্মতা প্রকাশ। |
| ইউরোপীয় ইউনিয়ন | পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে উভয় পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান। |
কাস্পিয়ান সাগরের মতো তুলনামূলক শান্ত জলপথে ইউক্রেনের এই আঘাত প্রমাণ করে যে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ভৌগোলিক বিস্তার অনেকটাই ছড়িয়ে পড়েছে। ইরানের এই খোলাখুলি হুমকির পর এখন ইউক্রেন বা ইজরায়েলের বিরুদ্ধে তেহরান কী ধরনের প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই নজর রাখছে গোটা বিশ্ব।






