বিশ্ব ফুটবলে ধুন্ধুমার যুদ্ধ! ২০৩০ বিশ্বকাপ বয়কটের ডাক দিল উয়েফা; স্পেনের খেলাই অনিশ্চিত?

বিশ্ব ফুটবলে ফের এক মারাত্মক সংকটের কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা এবং ইউরোপীয় ফুটবলের সর্বেসর্বা উয়েফার মধ্যে সংঘাত এখন চরমে। বিষয়টির কেন্দ্রবিন্দু—বিশ্বকাপ ফুটবলের বিপুল অর্থ ও বেসরকারিকরণ। যদি উয়েফা তাদের বয়কটের হুমকি সত্যি করে তোলে, তবে আগামী ২০৩০ ফুটবল বিশ্বকাপে দেখা যাবে না বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন স্পেন, পর্তুগাল, ফ্রান্স বা ইংল্যান্ডের মতো বিশ্বসেরা দলগুলোকে।
কেন চটল উয়েফা? নেপথ্যে ১০ বিলিয়ন ডলারের ‘প্রাইভেটাইজেশন’ ছক
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের একাধিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ফিফা সভাপতি জিয়ানি ইনফান্তিনো বিশ্বব্যাপী ফুটবলের প্রসারের অজুহাতে একটি বড় প্রস্তাব তৈরি করেছেন।
- বিশ্বকাপ পরিচালনার উদ্দেশ্যে ২০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের একটি গ্লোবাল কোম্পানি বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করা হবে।
- সেই কোম্পানির ১০ বিলিয়ন ডলারের (৫০%) অংশীদারিত্ব বা শেয়ার বিক্রি করে দেওয়া হবে বিদেশি বেসরকারি বিনিয়োগকারী সংস্থাগুলোর কাছে।
এই খবর সামনে আসতেই ক্ষেপে উঠেছে উয়েফা। ইউরোপীয় নিয়ামক সংস্থার মতে, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাকে এই উপায়ে কমার্শিয়াল ফান্ড বা বেসরকারি মূলধনে রূপান্তর করা ফুটবলের ঐতিহ্য ও অখণ্ডতাকে ধ্বংস করার সমান।
[ফিফা বনাম উয়েফা সংঘাতের মূল কারণ]
* ফিফার পরিকল্পনা: ২০ বিলিয়ন ডলারের কোম্পানি গড়ে ১০ বিলিয়ন ডলারের শেয়ার বেসরকারি সংস্থাকে বিক্রি করা।
* উয়েফার পাল্টা দাবি: ফুটবল সমর্থকদের খেলা, বিশ্বকাপ বিক্রির কোনো জিনিস নয়।
* চরম পদক্ষেপ: ৫৫টি ইউরোপীয় দেশকে নিয়ে জরুরি মিটিং ও ২০৩০ বিশ্বকাপ বয়কট।
উয়েফার জরুরি বৈঠক ও কড়া বার্তা
পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে চলতি সপ্তাহেই নিজেদের ৫৫টি সদস্য দেশকে জরুরি বৈঠকে তলব করেছে উয়েফা। এই বৈঠকে ফিফার একচ্ছত্র সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলার কৌশল ঠিক করা হবে, যেখানে মূল এজেন্ডা হিসেবে রাখা হচ্ছে বিশ্বকাপ বয়কটের সম্ভাবনা।
উয়েফা এক কড়া বিবৃতিতে জানিয়েছে—
“এই সিদ্ধান্ত সব সীমা অতিক্রম করে গিয়েছে। যারা ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করে, কিংবা ফুটবলকে নিয়ন্ত্রণ করে, সেই সব প্রতিষ্ঠানের এই ধরণের পদক্ষেপ করা মোটেও উচিত নয়। আমরা কেউই ফুটবলের একক মালিক নই। বিশ্বকাপ কোনো ফিফার হাতবদল বা বিক্রি করার সম্পদ হতে পারে না।”
সোশাল মিডিয়ায় প্রতিবাদের ঝড় ও রাষ্ট্রনেতাদের তোপ
ফিফার এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন ক্রীড়া বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদরাও। যুক্তরাজ্যের প্রখ্যাত রাজনীতিক অ্যান্ডি বার্নহাম এক্স (টুইটার) হ্যান্ডেলে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে লেখেন—
“ফুটবল কোনো প্রাইভেট ইনভেস্টরের নিজস্ব সম্পত্তি নয়। রোদ-ঝড়-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে যে সমর্থকরা স্টেডিয়ামের গ্যালারি ভরিয়ে তোলেন, ফুটবল শুধু তাঁদের। বিশ্বকাপ বেচাকেনার জিনিস হতে পারে না। যখনই তুমি কোনো কিছুর দাম ঠিক করে দেবে, তার মানে তুমি সেটা বিক্রি করতে চাইছ। ফুটবল চিরকাল বিশ্বব্যাপী ফ্যানদের ছিল, আছে এবং থাকবে।”
আগের ইতিহাস ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
উল্লেখ্য, এটিই প্রথম নয়। এর আগে ২০২১ সালেও দুই বছর অন্তর ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজনের একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিলেন ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনো। কিন্তু সেই সময়েও উয়েফা ও কনমেবল (দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবল কনফেডারেশন) একজোট হয়ে টুর্নামেন্ট বয়কটের হুমকি দিলে শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছিল ফিফা। এবার ১০ বিলিয়ন ডলারের এই মেগা কর্পোরেট চুক্তির সামনে ফিফা নতিস্বীকার করে নাকি ২০৩০ বিশ্বকাপ সত্যি ইউরোপীয় জায়ান্টদের ছাড়াই অনুষ্ঠিত হয়, সেদিকেই তাকিয়ে গোটা ক্রীড়াবিশ্ব।
এক নজরে বিতর্কের খুঁটিনাটি:
| বিষয় | বিস্তারিত তথ্য |
| সংঘাতের পক্ষ | ফিফা (FIFA) বনাম উয়েফা (UEFA) |
| মূল বিবাদ | ২০ ৩০ বিশ্বকাপ পরিচালনায় ১০ বিলিয়ন ডলারের প্রাইভেট ফান্ড গ্রহণ |
| উয়েফার সম্ভাব্য পদক্ষেপ | ৫৫টি দেশকে নিয়ে জরুরি বৈঠক ও ২০৩০ বিশ্বকাপ সম্পূর্ণ বয়কট |
| আশঙ্কাজনক বিষয় | স্পেন, ফ্রান্স, জার্মানি, ইংল্যান্ডের মতো প্রথম সারির দলগুলির অনুপস্থিতি |
ফুটবল সমর্থক এবং খেলার আবেগ সরিয়ে রেখে কোটি কোটি ডলারের করপোরেট চুক্তির পেছনে দৌড়াতে গিয়ে বিশ্ব ফুটবলকে এক অভূতপূর্ব বিভাজনের মুখে ঠেলে দিচ্ছে ফিফা। উয়েফার এই কঠোর বয়কট বার্তা শেষ পর্যন্ত ইনফান্তিনোকে তাঁর সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসতে বাধ্য করে কি না, সেটাই এখন কোটি টাকার প্রশ্ন।






