‘এনকাউন্টার’ নাকি ব্যক্তিগত আক্রোশে খুন? বিহারে তোলপাড় ফেলা ভিডিও ফাঁসের পর গ্রেপ্তার এসটিএফ জওয়ান, চাপে প্রশাসন

ভারতের একাধিক রাজ্যে সাম্প্রতিক সময়ে তথাকথিত ‘এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট’ পুলিশ আধিকারিকদের বীরের চোখে দেখা হলেও, বিহারের ভোজপুরে এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা পুরো সমীকরণ বদলে দিল। বন্দুক ছুড়ে আত্মসমর্পণ করা সত্ত্বেও এক জনপ্রিয় তরুণ ইনফ্লুয়েন্সারকে গুলি করে ‘খুন’ করার অভিযোগে এবার নিজেদেরই সহকর্মীকে হাজতে পুরল পুলিশ প্রশাসন।
কী ঘটেছিল ভোজপুরের সেই এনকাউন্টারের দিন?
গত ১৭ জুন বিহারের ভোজপুর জেলার শাহপুর থানা এলাকার বিলাউটি গ্রামে এক রক্তক্ষয়ী গুলির লড়াই বা ‘এনকাউন্টারের’ খবর সামনে আসে। নিহত ব্যক্তির নাম ভরত ভূষণ তিওয়ারি।
তবে স্থানীয়দের দাবি, ভরত কোনো সমাজবিরোধী বা দাগি অপরাধী ছিলেন না। তিনি ছিলেন মূলত এলাকার পরিচিত সমাজকর্মী ও ডিজিটাল ইনফ্লুয়েন্সার। প্রশাসনিক গাফিলতি ও উন্নয়নমূলক কাজ থমকে থাকার প্রতিবাদে প্রায়শই পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়াতেন তিনি এবং সেসব ভিডিও ফেসবুকে পোস্ট করে প্রতিবাদ গড়ে তুলতেন। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে দেখা যায়, তাঁর শরীরে ৪টি বুলেট আঘাত করেছিল।
[ঘটনা ও অভিযুক্তের সংক্ষিপ্ত বিবরণ]
* নিহত: ভরত ভূষণ তিওয়ারি (সমাজকর্মী ও ইনফ্লুয়েন্সার)
* এনকাউন্টারের তারিখ: ১৭ জুন, বিলাউটি গ্রাম (ভোজপুর, বিহার)
* এফআইআরে নাম: তৎকালীন ডিএসপি রাজেশ শর্মা, ওসি রাজেশ মালাকার, এসটিএফ জওয়ান অক্ষয় কুমার
* বর্তমান অবস্থা: মূল অভিযুক্ত এসটিএফ জওয়ান গ্রেপ্তার, চারজন বরখাস্ত (সাসপেন্ড)
এনকাউন্টারের ‘লাইভ’ ভিডিওতেই ফাঁদে পুলিশ!
ঘটনার পরপরই এনকাউন্টারের সমস্ত পুলিশি চিত্রনাট্য ভেস্তে দেয় সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিও।
এনকাউন্টার শুরু হওয়ার ঠিক কয়েক মুহূর্ত আগে ভরত ভূষণ তিওয়ারি নিজে ফেসবুকে একটি ভিডিও লাইভ পোস্ট করেছিলেন। সেই ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা যায়—
- ভরত নিজের হাতে থাকা আগ্নেয়াস্ত্রটি দূরে ছুঁড়ে দিচ্ছেন।
- তিনি নিচু হয়ে পুলিশের সামনে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ (Surrender) করছেন।
এই ভিডিও সামনে আসতেই পুরো বিহারজুড়ে ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। সাধারণ মানুষের একাংশের দাবি, এলাকার প্রতিবাদী কণ্ঠকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিতে ব্যক্তিগত রোষ থেকেই এই ‘ভুয়ো এনকাউন্টার’ সাজিয়ে তাঁকে ঠান্ডা মাথায় হত্যা করা হয়েছে।
রাজনৈতিক আলোড়ন ও সরকারের পদক্ষেপ
ভিডিওটি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ার পর তিওয়ারি সমাজ তথা সবর্ণদের একাংশ রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারি দেয়। পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠলে বিহারের সম্রাট চৌধুরী সরকার তড়িঘড়ি উচ্চপর্যায়ের তদন্তের নির্দেশ দেয়।
ঘটনায় জড়িত থাকার প্রাথমিক প্রমাণের ভিত্তিতে—
- জগদীশপুরের তৎকালীন ডিএসপি রাজেশ শর্মা, শাহপুর থানার তখনকার ওসি রাজেশ মালাকার এবং এসটিএফ জওয়ান অক্ষয় কুমারসহ ৪ জন পুলিশকর্মীকে বরখাস্ত করা হয়।
- এফআইআরের ভিত্তিতে মূল অভিযুক্ত এসটিএফ জওয়ান অক্ষয় কুমারকে পুলিশ ইতিমধ্যেই গ্রেপ্তার করেছে।
- বাকি আধিকারিকদের ভূমিকা নিয়ে বিভাগীয় তদন্ত জারি রয়েছে।
এক নজরে বিহার ভুয়ো এনকাউন্টার মামলা:
| বিষয় | তথ্য / বিবরণ |
| ঘটনাস্থল | বিলাউটি গ্রাম, শাহপুর থানা (ভোজপুর, বিহার) |
| নিহত ব্যক্তি | ভরত ভূষণ তিওয়ারি (সমাজকর্মী ও ইনফ্লুয়েন্সার) |
| অভিযোগ | আত্মসমর্পণ সত্ত্বেও ব্যক্তিগত রোষে ভুয়ো এনকাউন্টারে হত্যা |
| আইনি পদক্ষেপ | এসটিএফ জওয়ান গ্রেপ্তার, ডিএসপি ও ওসিসহ ৪ আধিকারিক বরখাস্ত |
| প্রশাসনিক বার্তা | এনকাউন্টার কালচারে বিহার সরকারের চরম কঠোর অবস্থান |
ইদানীংকালে দেশের একাধিক প্রান্তে অপরাধ দমনের নামে দ্রুত বিচার বা ‘এনকাউন্টার’-এর যে প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে, বিহারের এই নজিরবিহীন ঘটনা তার ওপর বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করল। বিচারব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে আইনি ক্ষমতার অপব্যবহার করলে খোদ রক্ষককেই যে ভক্ষক হিসেবে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হতে পারে, বিহারের পুলিশ গ্রেপ্তারি সেই সতর্কবার্তাই স্পষ্ট করে দিল।






