“উর্দির ভেতরেও একটা মানুষ থাকে!” নিট প্রশ্নফাঁস ও সংসদ অভিযানে আহত দিল্লি পুলিশকর্মীদের পরিবারের হাহাকার

নিট (NEET) প্রশ্নফাঁস কাণ্ডকে কেন্দ্র করে দিল্লির যন্তর মন্তর ও সংসদ অভিযান চত্বর উত্তপ্ত। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস এবং ছররা গুলি ব্যবহারের অভিযোগে বিরোধী রাজনীতি ও আইনজীবী মহল যখন দিল্লি পুলিশকে কাঠগড়ায় তুলছে, তখন এবার উল্টো সুর শোনালেন খোদ আক্রান্ত পুলিশকর্মীদের প্রিয়জনেরা। উর্দির আড়ালে থাকা মানুষগুলোর ওপর নেমে আসা হিংসার চাঞ্চল্যকর বর্ণনা দিলেন তাঁরা।
“মাথায় চারটে সেলাই, রক্তে ভেজা উর্দি নিয়ে ফিরলেন বাবা”
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কুঞ্জল, যাঁর বাবা দিল্লি পুলিশের একজন সাব-ইনস্পেক্টর হিসেবে ওই দিন ডিউটিতে ছিলেন, তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান— আন্দোলনটি মোটেও স্রেফ শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ মিছিল ছিল না।
কুঞ্জলের কথায়—
“বাবা বাড়ি ফিরে বলেছিলেন, ওখানে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বহু দাগি আসামি ও বহিরাগত দুষ্কৃতী ঢুকে পড়েছিল। তার পরের দিনই বাবা গণপিটুনির মুখোমুখি হন। অচৈতন্য অবস্থায় প্রায় চার ঘণ্টা হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। যখন সহকর্মীদের সাহায্যে বাড়ি ফিরলেন, তাঁর পুরো পোশাক রক্তে ভেজা ছিল। মাথায় চারটে সেলাই পড়েছে, অথচ আমাদের শান্ত রাখতে বলেছিলেন সামান্য চোট লেগেছে।”
[পুলিশ পরিবারের মূল অভিযোগসমূহ]
* ছদ্মবেশে দুষ্কৃতীদের উপস্থিতি: আন্দোলনকারীদের ভিড়ে দাগি অপরাধীদের অনুপ্রবেশের অভিযোগ।
* শারীরিক আক্রমণ: ইঁট-পাথর ছোড়া এবং পুলিশ কর্মীদের অচৈতন্য করে পেটানো।
* নিম্নমানের সুরক্ষা সরঞ্জাম: পুলিশকে সরবরাহ করা হেলমেট ও গার্ড নিয়ে প্রশ্ন।
* একতরফা তথ্য প্রকাশ: সংবাদমাধ্যমে পুলিশকে কেবল 'আক্রমণকারী' হিসেবে দেখানোর বিরোধিতা।
“পাথরের বৃষ্টিতে আর একটু হলেই প্রাণ যেত স্বামীর”
একইভাবে নিজের আতঙ্ক ও ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব-ইনস্পেক্টরের স্ত্রী সীমা। ২০ জুলাইয়ের সেই অভিশপ্ত বিকালের কথা মনে করে তিনি শিউরে ওঠেন।
সীমা জানান,
“প্রতিদিনের মতোই টিফিন নিয়ে বেরিয়েছিল আমার স্বামী। কিন্তু বিকেলে ফোন পেয়ে শুনি ও হাসপাতালে ভর্তি। বিক্ষোভকারীরা যা হাতে পেয়েছে, তাই ছুড়ে মেরেছে। পুলিশকে যে হেলমেট দেওয়া হয়েছিল, তা অত্যন্ত খারাপ মানের। পাথরের আঘাতে সেদিন হেলমেট ফেটে গেলে স্বামী আর জীবিত ফিরত না। উর্দির পিছনেও একটা মানুষ থাকে, যাঁর ঘরে ফেরার জন্য পরিবার পথ চেয়ে বসে থাকে— এটা কেন সবাই ভুলে যাচ্ছে?”
দু’পক্ষের সংঘাত ও আইনজীবীদের পাল্টা অভিযোগ
উল্লেখ্য, ককরোচ জনতা পার্টির ডাকা এই আন্দোলনে পুলিশের বিরুদ্ধে অতিসক্রিয়তার মারাত্মক অভিযোগ তুলেছেন বিক্ষোভকারীরা। আইনজীবীদের দাবি—
- পুলিশি ব্যাজ না পরেই অনেক পুলিশ কর্মী আন্দোলনকারী মহিলাদের ওপর চড়াও হন।
- মহিলা আন্দোলনকারীদের সংবেদনশীল অঙ্গে আঘাত করা হয়।
- টিয়ার গ্যাস ও লাঠিচার্জে আহত হন বহু পড়ুয়া।
তবে দিল্লি পুলিশের পরিবারের সদস্যদের সাফ কথা— বিষয়টি সম্পূর্ণ একতরফাভাবে তুলে ধরা হচ্ছে। পুলিশ স্রেফ নিজের দায়িত্ব পালন করছিল, অথচ আজ তাদের খলনায়ক বা আক্রমণকারী হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
এক নজরে সংঘর্ষ ও দুই পক্ষের দাবি:
| বিষয় | আন্দোলনকারী / আইনজীবীদের দাবি | আহত পুলিশ পরিবারের বক্তব্য |
| পরিস্থিতি | শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলনে বরবর পুলিশি আক্রমণ | ছদ্মবেশী অপরাধীদের হামলায় মারাত্মক আহত পুলিশ |
| আঘাতের ধরণ | লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস ও গোপনাঙ্গে আঘাতের অভিযোগ | ইঁট-পাথরের বৃষ্টিতে মাথায় সেলাই ও হাসপাতালে ভর্তি |
| মূল বক্তব্য | নিরপেক্ষ তদন্ত ও পুলিশের শাস্তি | উর্দির আড়ালে থাকা মানবিক দিকটির স্বীকৃতি দাবি |
সংসদ অভিযান ঘিরে তৈরি হওয়া এই নজিরবিহীন বিতর্ক দুই ভিন্ন সত্যকে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। একদিকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের অধিকার ও সুরক্ষার প্রশ্ন, অন্যদিকে আইনি শৃঙ্খলা রক্ষা করতে গিয়ে জখম হওয়া পুলিশকর্মীদের পারিবারিক উদ্বেগ। এই জটিল পরিস্থিতিতে প্রকৃত সত্য উন্মোচনে একটি নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিই জোরালো হয়ে উঠছে।






