তারাপীঠ অগ্নিকাণ্ড: বাথরুমে জল চালিয়ে জানলা ভেঙে প্রাণরক্ষা! নারকীয় অভিজ্ঞতার কথা শোনালেন পর্যটক

ভোরের আলো ফোটার আগেই তারাপীঠের বেসরকারি হোটেলে লাগা আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে একাধিক প্রাণ। যারা বেঁচে ফিরেছেন, তাঁদের মুখে কেবলই মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার শিহরণ জাগানো গল্প। কীভাবে ধোঁয়ায় ভরা ঘরের মধ্যে দুটো ছোট বাচ্চা আর স্ত্রীকে নিয়ে মৃত্যুর সাথে লড়াই করলেন, সেই নারকীয় অভিজ্ঞতার কথা শোনালেন পর্যটক তপজ্যোতি মণ্ডল।
“মনে হচ্ছিল সব শেষ!” — বাথরুমে ৪৫ মিনিটের লড়াই
পরিবার নিয়ে তারাপীঠে বেড়াতে এসেছিলেন তপজ্যোতি মণ্ডল। ভোররাতে বিকট শব্দ ও ধোঁয়ায় ঘুম ভাঙলে ঘরের দরজা খুলেই তিনি দেখেন, রিসেপশনের দিক থেকে আগুনের লেলিহান শিখা তেড়ে আসছে।
প্রাণ বাঁচাতে স্ত্রী ও দুই ছোট সন্তানকে নিয়ে বাথরুমে ঢুকে পড়েন তপজ্যোতিবাবু।
তপজ্যোতিবাবু জানান:
“৪৫ মিনিটের মধ্যে মনে হচ্ছিল সব শেষ। রুমের দরজা খুলে বেরোতে গিয়ে দেখি রিসেপশনের দিক থেকে আগুন আসছে। বাধ্য হয়ে স্ত্রীকে আর দুটো বাচ্চাকে নিয়ে বাথরুমে ঢুকে পড়ে দরজা বন্ধ করে দিই, যাতে ধোঁয়া না ঢোকে। তারপর ভেতরে ক্রমাগত জল চালিয়ে রেখেছিলাম আর জানলা ভেঙে বাইরে থেকে নিশ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করছিলাম। ৪৫ মিনিট পর পুলিশ গিয়ে আমাদের উদ্ধার করে।”
এই আগুনে তাঁর বৃদ্ধা মা ও দুই বোন বিষাক্ত ধোঁয়ায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন।
[তপজ্যোতি মণ্ডলের পরিবারের বাঁচার কৌশল]
১. ধোঁয়া আটকাবে বলে বাথরুমের দরজা শক্ত করে আঁটকে দেওয়া।
২. বাথরুমের ভেতরের সমস্ত কল চালিয়ে জলপ্রবাহ বজায় রাখা।
৩. ঘরের জানলা ভেঙে বাইরের বাতাস নিয়ে নিশ্বাস নেওয়া।
৪. ৪৫ মিনিট পর উদ্ধারকারী পুলিশ টিমের হাতে জীবন রক্ষা।
ঘুমন্ত অবস্থায় দগ্ধ আবাসিক ও স্বজন হারানোর হাহাকার
অনেকে ঘুমন্ত অবস্থাতেই আগুনে ঝলসে গেছেন, আবার অনেকে প্রাণ বাঁচাতে পালানোর চেষ্টা করতে গিয়ে আগুনের মুখে পড়েন। পুলিশ ও দমকলকর্মীরা হোটেলের পেছনের বিপজ্জনক সিঁড়ি দিয়ে বহু মানুষকে নামিয়ে আনেন।
ঘটনাস্থলে দেখা গেল এক করুণ দৃশ্য—মালদহের এক পর্যটক নিজের হোটেল রুম থেকে বাঁচতে পারলেও, বাইরে দাঁড়িয়ে অপলক চোখে ধোঁয়া ওঠা হোটেলের দিকে তাকিয়ে আছেন। মা, ভাই এবং ভাইয়ের বউকে কোথাও খুঁজে না পেয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছেন তিনি।
হোটেলের মূল গেটের সামনে এক ব্যক্তির কাঁধ পর্যন্ত পুরো ঝলসে গিয়েছিল। মুখ-মাথা দেখে চেনার উপায় ছিল না। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে পাঠায় পুলিশ ও দমকল।
পুলিশি অ্যাকশন ও হোটেল মালিক আটক
দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই পুরো হোটেল চত্বর ঘিরে ফেলে পুলিশ ও প্রশাসন। হোটেলটিতে অগ্নিনিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত কোনো ছাড়পত্র (Fire NOC) ছিল কিনা এবং নিরাপত্তার খামতি ছিল কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
| প্রশাসনিক আপডেট | বিবরণ |
| হোটেল মালিকের অবস্থান | আটক করে থানায় জিজ্ঞাসাবাদ চালাচ্ছ পুলিশ |
| তদন্তের দায়িত্ব | যৌথভাবে তারাপীঠ থানা, পুলিশ ও দমকল বিভাগ |
| দমকলমন্ত্রীর বক্তব্য | ঘটনার সুনির্দিষ্ট তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন দমকলমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী |
ভোররাতের এই অগ্নিকাণ্ড তারাপীঠের হোটেলগুলির অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার কঙ্কালসার রূপটি প্রকাশ্যে এনে দিয়েছে। বহু নিরীহ পুণ্যার্থীর প্রাণ যাওয়ার পর এবং বহু পরিবার নিঃস্ব হওয়ার পর প্রশাসন কী ব্যবস্থা নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে গোটা রাজ্য।






