নেপালের ভয়াবহ হড়পা বানের নেপথ্যে গ্লেসিয়ার লেক বার্স্ট! উত্তরবঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গের জন্য কতটা বিপজ্জনক? লিখছেন নদী বিশেষজ্ঞ কল্যাণ রুদ্র

- প্রকৃতির চরম প্রতিশোধ: বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত গলে পিছু হটছে এবং নতুন বিপজ্জনক হিমবাহ হ্রদ (Glacial Lakes) তৈরি হচ্ছে।
- বিপর্যয়ের মূল কারণ: চিনের তিব্বত অংশে বরফ ও পাথরের বিরাট ধস লেন্দে খোলার প্রবাহ আটকে কৃত্রিম জলাধার তৈরি করেছিল। সেই বাঁধ ভেঙে সেকেন্ডের মধ্যে ৩৩ ফুট উঁচু কাদা-পাথরের দেওয়াল নেমে আসে।
- ভূমিকম্পের যোগসূচি: বিপর্যয়ের সময় তিব্বত অঞ্চলে ৪.৪ মাত্রার একটি ভূকম্পন রেকর্ড করা হয়, যা পাহাড়ি ধস নামাতে প্রভাব ফেলে থাকতে পারে।
- পশ্চিমবঙ্গের জন্য চরম ঝুঁকি: হিমালয়ে তৈরি হওয়া ২০০টিরও বেশি বিপজ্জনক হিমবাহ হ্রদের মধ্যে ১৭টি সিকিমে অবস্থিত। এগুলি ফাটলে তিস্তা ও গঙ্গা অববাহিকা ধরে উত্তরবঙ্গ ও বিহারের সমতলভূমিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা প্রবল।
নেপালে আকস্মিক মহাপ্রলয়: কেন কোনো পূর্বাভাস ছিল না?
নদী বিশেষজ্ঞ কল্যাণ রুদ্রের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নেপালের রসুয়া সংলগ্ন প্লাবনভূমি অত্যন্ত খাড়া। ফলে সামান্য ধস বা তুষারপাতও নদীর খাতকে পুরোপুরি অবরুদ্ধ করে ফেলে। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে স্পষ্ট যে, কোনো স্থানীয় মেঘভাঙা বৃষ্টি বা আবহাওয়া সংক্রান্ত সতর্কবার্তা ছাড়াই মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বিপুল জলরাশি পাথর ও কাদা নিয়ে নেমে এসেছে।
পাহাড়ি উপত্যকায় অনিয়ন্ত্রিত জনবসতি, নদীখাত দখল এবং অপরিকল্পিত নির্মাণের ফলে এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় মানবসৃষ্ট ধ্বংসলীলায় পরিণত হয়েছে।
হিমালয়ে ঘটা অতীতের কিছু ভয়াবহ GLOF বিপর্যয়
| বছর / সময় | স্থান / নদী | বিপর্যয়ের ধরন ও ক্ষয়ক্ষতি |
| ১৯৮১ | ঝাংঝাংবো হ্রদ (নেপাল-তিব্বত) | বাঁধ ভেঙে ১ ঘণ্টায় ১.৯ কোটি ঘনমিটার জল নেমে ধ্বংসলীলা চালায়। |
| ২০১৩ (জুন) | চুরাবারি হিমবাহ, কেদারনাথ | হিমবাহ হ্রদ ফেটে ও মেঘভাঙা বৃষ্টিতে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। |
| ২০২৩ (অক্টোবর) | দক্ষিণ লোঙ্ক হ্রদ, সিকিম | হ্রদ বিস্ফোরণে (GLOF) তিস্তা নদী প্লাবিত হয় ও একাধিক বিদ্যুৎ প্রকল্প ধ্বংস হয়। |
| ২০২৫ (আগস্ট) | উত্তরকাশীর ধারালি | পাহাড়ে ভারী ডেব্রিস ফ্লো এবং হড়পা বানে সম্পূর্ণ লোকালয় তছনছ হয়। |
[বিশ্ব উষ্ণায়ন ও হিমবাহ গলে পিছু হটা] ➔ [পাহাড়ে ক্ষতিকর হিমবাহ হ্রদের আয়তন বৃদ্ধি] ➔ [তুষারধস বা ভূকম্পনে বাঁধ বিস্ফোরণ (GLOF)] ➔ [উত্তরবঙ্গ, বিহার ও সমতলে স্থায়ী হুমকির ছায়া]
বাংলার জন্য কতটা ঝুঁকি ও করণীয়
কল্যাণ রুদ্রের মতে, নেপাল ও সিকিমের এই ভাঙন কেবল পাহাড়েই সীমিত থাকছে না। উত্তরবঙ্গের দার্জিলিং এবং কালিম্পং জেলা এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। সিকিমের গ্লেসিয়ার লেক ফেটে গেলে তিস্তা, রংপো, রিয়াং, মহানন্দা, বালাসন, তোর্সা ও জলঢাকা অববাহিকা ধরে নেমে আসা পলি ও ডেব্রিস উত্তরবঙ্গের বাস্তুতন্ত্রকে তছনছ করে দিতে পারে। ফারাক্কা ব্যারেজও নদীর পলি পরিবহণ বদলে সমতলের বিপদ বাড়িয়েছে।
জরুরি প্রশাসনিক পদক্ষেপ:
- সিকিম ও নেপাল সীমান্তের হিমবাহ হ্রদগুলোতে ২৪ ঘণ্টা নজরদারির জন্য ‘আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম’ বসানো।
- নদীর প্লাবনভূমি ও পাহাড়ি ঢালে দ্রুত অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণ বন্ধ করে কঠোর ভূমি-ব্যবহার নীতি প্রয়োগ করা।
- সমতল ও উত্তরবঙ্গের নদীখাত নিয়মিত ড্রেজিং ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা।






