
উত্তরাখণ্ডের কুমায়ুন পাহাড়ের কোলে ছোট্ট এক আশ্রম। চারপাশে সবুজ পাহাড়, শান্ত পরিবেশ আর আধ্যাত্মিক আবহ। জায়গাটির নাম কাইঞ্চি ধাম। পবনপুত্র হনুমানের আরাধনাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই তীর্থক্ষেত্র শুধু ধর্মীয় স্থান নয়, বহু মানুষের কাছে এটি মানসিক শান্তি ও আত্মঅনুসন্ধানের ঠিকানা।
এই আশ্রমের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে সাধক নিম করোলি বাবা বা ভক্তদের প্রিয় ‘মহারাজ-জি’-র নাম। সম্প্রতি তাঁর জীবনকে কেন্দ্র করে তৈরি ‘হনুমান অংশ’ সিনেমা মুক্তির পর কাইঞ্চি ধামকে ঘিরে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। পর্যটক ও ভক্তদের আনাগোনাও বেড়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
কেন নাম ‘কাইঞ্চি ধাম’?
কথিত আছে, নিম করোলি বাবার উদ্যোগে এখানে প্রথম মন্দিরের প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৬৮ সালে।
স্থানীয়ভাবে প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, এখানকার দুটি পাহাড় এমনভাবে একে অপরকে ছেদ করেছে যে দূর থেকে দেখতে অনেকটা কাঁচির মতো আকৃতি তৈরি হয়। সেই থেকেই জায়গাটির নাম কাইঞ্চি ধাম।
তবে এই স্থানের জনপ্রিয়তার মূল কারণ শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়। নিম করোলি বাবার সাধনা, হনুমানভক্তি এবং তাঁর জীবনদর্শনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে এই আশ্রম।
কে ছিলেন নিম করোলি বাবা?
ভক্তদের কাছে ‘মহারাজ-জি’ নামে পরিচিত নিম করোলি বাবার আসল নাম ছিল লক্ষ্মণ নারায়ণ শর্মা। উত্তরপ্রদেশে জন্ম নেওয়া এই সাধক পরবর্তী জীবনে সংসার ত্যাগ করে আধ্যাত্মিক সাধনায় নিজেকে নিয়োজিত করেন।
তিনি ছিলেন ভগবান হনুমানের একনিষ্ঠ ভক্ত। তাঁর আশ্রম ও কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতেও ছিল হনুমান উপাসনা।
তাঁর শিক্ষার মূল কথাগুলি ছিল অত্যন্ত সহজ—মানুষকে ভালোবাসা, মানুষের সেবা করা এবং ঈশ্বরকে স্মরণ করা।
দীর্ঘ বক্তৃতা বা জটিল দর্শনের পরিবর্তে নিজের জীবনযাপন ও আচরণের মাধ্যমেই তিনি অনুসারীদের শিক্ষা দিতেন বলে ভক্তদের বিশ্বাস।

নিম করোলি বাবাকে ঘিরে নানা অলৌকিক কাহিনি
নিম করোলি বাবাকে নিয়ে অসংখ্য কাহিনি লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে। তাঁর ভক্তদের অনেকেই বিশ্বাস করেন, তিনি অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন।
এর মধ্যে একটি বহুল প্রচলিত কাহিনি হল, একবার তাঁকে রেলগাড়ি থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এরপর নাকি ট্রেনটি আর চলছিল না। বহু অনুরোধের পর তিনি ফের ট্রেনে উঠতেই সেটি চলতে শুরু করে।
এই ধরনের কাহিনির ঐতিহাসিক সত্যতা যাচাই করা কঠিন হলেও ভক্তদের কাছে এগুলি আজও বিশ্বাস ও আস্থার অংশ।

রিচার্ড অ্যালপার্ট থেকে রামদাস
নিম করোলি বাবার প্রভাব শুধু ভারতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁর অন্যতম পরিচিত অনুসারী ছিলেন মার্কিন নাগরিক রিচার্ড অ্যালপার্ট।
বাবার সংস্পর্শে আসার পর তাঁর জীবনে বড় পরিবর্তন আসে বলে জানা যায়। পরবর্তীকালে তিনি ‘রামদাস’ নাম গ্রহণ করেন এবং আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের পথে এগিয়ে যান।
তাঁর বিখ্যাত বই ‘Be Here Now’-তে নিম করোলি বাবার সঙ্গে তাঁর অভিজ্ঞতা ও আধ্যাত্মিক যাত্রার কথা উঠে এসেছে। পশ্চিমে নিম করোলি বাবার শিক্ষা এবং ভারতীয় আধ্যাত্মিকতার পরিচিতি ছড়িয়ে দিতে বইটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

স্টিভ জবসও এসেছিলেন কাইঞ্চি ধামে
কাইঞ্চি ধামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সবচেয়ে আলোচিত আন্তর্জাতিক নামগুলির অন্যতম স্টিভ জবস।
জানা যায়, ১৯৭৪ সালে ভারত সফরের সময় অ্যাপলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস নিম করোলি বাবার আশ্রমে এসেছিলেন। তাঁর এই ভারত সফর ও আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের গল্প পরবর্তীকালে বহুবার আলোচনায় এসেছে।
আরও এক বিখ্যাত প্রযুক্তি ব্যক্তিত্বের সঙ্গেও কাইঞ্চি ধামের নাম জড়িয়ে রয়েছে।
জাকারবার্গকে নাকি কাইঞ্চি ধামের কথা বলেছিলেন জবস
২০১৫ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ জানিয়েছিলেন, স্টিভ জবসের পরামর্শেই তিনি কাইঞ্চি ধামে এসেছিলেন।
সেই সময় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি মানসিকভাবে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ছিলেন বলেও জানিয়েছিলেন জাকারবার্গ। কাইঞ্চি ধাম সফরের পর তাঁর জীবনে নতুন দিশা পাওয়ার অভিজ্ঞতার কথাও বিভিন্ন সময়ে আলোচিত হয়েছে।

বিরাট-অনুষ্কার সঙ্গেও জড়িয়েছে আশ্রমের নাম
ভারতীয় ক্রিকেট তারকা বিরাট কোহলি এবং অভিনেত্রী অনুষ্কা শর্মা-র সঙ্গেও নিম করোলি বাবার আশ্রমের নাম জড়িয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
ইন্টারনেটে তাঁদের কাইঞ্চি ধাম সফরের ছবি বলেও কিছু ছবি ছড়িয়ে পড়েছিল। যদিও এই খবরের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে এবং তাঁদের সফরের সঙ্গে পরবর্তী জীবনের পরিবর্তনের সরাসরি যোগসূত্রও নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়।

‘হনুমান অংশ’-এর পর ফের আলোচনায় কাইঞ্চি ধাম
চলতি বছর মুক্তি পেয়েছে হিন্দি সিনেমা ‘হনুমান অংশ’। নিম করোলি বাবার জীবনকে কেন্দ্র করে তৈরি এই বায়োপিক মুক্তির পর থেকেই কাইঞ্চি ধাম নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
ছবিটির সাফল্যের পাশাপাশি নিম করোলি বাবার জীবন ও দর্শন নিয়েও দর্শকদের মধ্যে কৌতূহল বেড়েছে। ফলে উত্তরাখণ্ডের এই আশ্রমে পর্যটক ও ভক্তদের আনাগোনাও বাড়ছে বলে জানা যাচ্ছে।

নৈনিতাল থেকে মাত্র ১৭ কিলোমিটার
কাইঞ্চি ধাম নৈনিতাল থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। গাড়িতে যেতে আনুমানিক ৪৫ মিনিটের মতো সময় লাগে।
তাই নৈনিতাল ভ্রমণের সঙ্গে কাইঞ্চি ধামও রাখা যায় পর্যটন তালিকায়। তবে শুধু সাফল্য বা কোনও অলৌকিক প্রত্যাশা নিয়ে নয়—পাহাড়, প্রকৃতি, নীরবতা এবং আধ্যাত্মিক পরিবেশ অনুভব করতেও এই জায়গায় যাওয়া যায়।
সবুজ পাহাড়ের কোলে শান্ত এই ধাম আজ তাই শুধু একটি তীর্থস্থান নয়। নিম করোলি বাবার জীবনদর্শন, হনুমানভক্তি এবং বিশ্বজুড়ে তাঁর প্রভাবের এক গুরুত্বপূর্ণ স্মারক হয়ে উঠেছে কাইঞ্চি ধাম।






