Durga Puja Non Veg Controversy: আমিষ নিয়ে বাগেশ্বর বাবার মন্তব্যে বিতর্ক

দুর্গাপুজোয় আমিষ খাবার নিয়ে বিতর্ক যেন কিছুতেই থামছে না। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের আমিষ বিতর্কের মাঝেই এবার দুর্গাপুজোর সময়ে আমিষ খাওয়া নিয়ে মন্তব্য করলেন বাগেশ্বর বাবা। তাঁর দাবি, দুর্গাপুজো বা নবরাত্রির সময়ে যারা আমিষ খান, তাঁরা ‘পাষণ্ডী’। ধর্মগুরুর এই মন্তব্য ঘিরেই শুরু হয়েছে নতুন করে বিতর্ক।
বাগেশ্বর বাবা বলেন, “পশ্চিমবঙ্গে একটা জিনিসই খুব খারাপ লাগে, দুঃখ হয়, নবরাত্রির সময় মণ্ডপের আশেপাশে আমিষ খাওয়া হয়। যত সব খারাপ খাবার তৈরি হয়। যা আমার একেবারেই পছন্দ নয়।”
এরপর বাংলার মানুষের উদ্দেশে তিনি বলেন, পুজোয় সব হিন্দুর জেগে ওঠা উচিত এবং আমিষভোজীদের বহিষ্কার করা উচিত। তাঁর বক্তব্য, আমিষ খাওয়া ব্যক্তিরা ‘ধার্মিক নন’ এবং তাঁদের ‘পাখণ্ডী’। ‘পাখণ্ডী’ শব্দের অর্থ ভেকধারী বা ভণ্ড ধর্মাচরণকারী।
শুধু আমিষ খাবার নয়, পেঁয়াজ খাওয়া এবং নির্দিষ্ট দিনে মদ্যপান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। বাগেশ্বর বাবার বক্তব্য, কেউ যদি মঙ্গলবার হনুমানজির কারণে মদ্যপান না করেন, তাহলে অন্য দিন কেন করেন—সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত যাঁরা দুর্গাপুজোয় আমিষ খাওয়ার বিরোধী, তাঁদের মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে সমর্থন জানানোর আহ্বান জানান বাগেশ্বর বাবা। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে উপস্থিত বহু মানুষ তাঁকে সমর্থন করেন বলে জানা গিয়েছে।
তবে তাঁর এই মন্তব্যের পরেই প্রশ্ন উঠেছে, কোনও ব্যক্তির খাদ্যাভ্যাস নিয়ে ধর্মীয় নির্দেশ বা ‘ফতোয়া’ জারি করা কতটা গ্রহণযোগ্য? সমালোচকদের একাংশের বক্তব্য, কে কী খাবেন, তা ব্যক্তিগত পছন্দ ও স্বাধীনতার বিষয়। ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কারও খাদ্যাভ্যাস নির্ধারণ করে দেওয়া উচিত নয় বলেও মত তাঁদের।
পালটা শমীক ভট্টাচার্যের
বাগেশ্বর বাবার বক্তব্যের বিরোধিতা করেছেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। তাঁর বক্তব্য, বাঙালির খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে মাছ-মাংস দীর্ঘদিন ধরেই যুক্ত।
শমীক বলেন, “আমরা সাধারণত নবমীর দিন পাঠার মাংস খাই। অষ্টমীর দিন লুচি খাই। সেটাই খাবো। বাংলার মানুষকে খাওয়াদাওয়া নিয়ে কিছু বলার নেই। বাঙালি মাছ, মাংস খাবে না এটা হয় নাকি?”
বাগেশ্বর বাবার মন্তব্যকে তাঁর ব্যক্তিগত বক্তব্য হিসেবেই দেখার কথা বলেন তিনি। তাঁর কথায়, কোনও সাধুর বক্তব্যের ভিত্তিতে বাংলার মানুষ কী খাবেন, তা বন্ধ করে দেওয়া হবে না।
কে এই বাগেশ্বর বাবা?
বাগেশ্বর বাবা নামে পরিচিত ধর্মগুরুর আসল নাম ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ গর্গ। মধ্যপ্রদেশের ছতরপুরের গড়া গ্রামে তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা। তাঁর দাদু পুরোহিত ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই ধর্মীয় পরিবেশে বড় হয়েছেন তিনি।
নির্মোহী আখড়ার হনুমান মন্দিরে ভক্তদের নিয়ে সভা করতেন এবং সেখান থেকেই রামচরিতমানস পাঠ শুরু করেন বলে তাঁর জীবনী সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ছোটবেলায় দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে বলেও জানা যায়।
পরবর্তীতে নির্মোহী আখড়ার কাছে ‘দৈব দরবার’ শুরু করেন তিনি। হনুমানজিকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় বক্তব্য রাখতে শুরু করেন। পরে নিজেকে ধর্মগুরু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর ভক্তদের একাংশ তাঁকে অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী বলেও মনে করেন।
গদা ও পাগড়ি তাঁর পরিচয়ের অন্যতম অংশ হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে মধ্যপ্রদেশের বাইরে দেশ-বিদেশেও তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়ে। তাঁর ভক্তদের মধ্যে এমন দাবিও শোনা যায় যে, তিনি ভক্তদের মনের কথা আগে থেকেই জানেন কিংবা ‘চিরকুটে’ তাঁদের ইচ্ছা লিখে দিতে পারেন। ভূত তাড়ানোর দাবিও তাঁকে ঘিরে রয়েছে।
বিতর্ক পিছু ছাড়ে না
বাগেশ্বর বাবাকে ঘিরে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। এর আগে এনসিইআরটির তৃতীয় শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকের একটি অধ্যায় নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন তিনি এবং সেখানে ‘লাভ জেহাদ’-এর প্রচার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছিলেন।
সিঁদুর ও মঙ্গলসূত্র না পরা মহিলাদের নিয়েও তাঁর কিছু মন্তব্য বিতর্ক তৈরি করেছিল। শিরডি সাঁইবাবা এবং ছত্রপতি শিবাজিকে নিয়েও তাঁর বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক হয়েছিল।
বাংলায় ধর্মীয় অনুষ্ঠান করা নিয়েও তাঁর সঙ্গে তৎকালীন রাজ্য সরকারের অবস্থান নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। পরে বর্তমান সরকারের আমলে তাঁকে সাড়ম্বরে স্বাগত জানানো হয় বলে দাবি করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাগেশ্বরধামে গিয়ে তাঁকে নিজের ‘ছোট ভাই’ বলে উল্লেখ করেছিলেন বলেও জানা যায়।
এবার বাংলার মাটিতে দাঁড়িয়ে দুর্গাপুজোয় আমিষ খাওয়া নিয়ে তাঁর মন্তব্য নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে। একদিকে ধর্মীয় বিশ্বাস ও খাদ্যাভ্যাসের প্রশ্ন, অন্যদিকে বাঙালির দীর্ঘদিনের মাছ-মাংস খাওয়ার সংস্কৃতি—দুইয়ের সংঘাতেই সরগরম রাজনৈতিক ও সামাজিক মহল।






