
ভারতের উৎসবের বৈচিত্র্য চিরকালই বিস্ময়কর। একেক অঞ্চলের সংস্কৃতি, মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা এবং বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে পরিচিত উৎসবগুলিও সম্পূর্ণ নতুন রূপ পায়। বসন্তের বদলে বর্ষাকালে হোলি খেলা, আর আবীরের জায়গায় প্রধান উপাদান যদি হয় টাটকা মাখন—তবে বিষয়টা বেশ অবাক করার মতোই। উত্তরাখণ্ডের পাহাড়ি উপত্যকায় বহুকাল ধরে পালিত হয়ে আসছে তেমনই এক প্রাচীন পরব, যার নাম ‘আন্দুরি উৎসব’ (Anduri Utsav) বা ‘মাখন হোলি’।
দায়ারা বুগিয়াল ও পশুপালকদের জীবনগাথা
উত্তরাখণ্ডের উত্তরকাশী জেলার রাইথাল (Raithal) গ্রামের কাছে অবস্থিত বিস্তীর্ণ সবুজ পাহাড়ি তৃণভূমি, যা স্থানীয় ভাষায় ‘দায়ারা বুগিয়াল’ (Dayara Bugyal) নামে পরিচিত।
- গ্রীষ্মকালীন চারণ: প্রতি বছর গ্রীষ্মের শুরুতে গ্রামের রাখালেরা তাঁদের গবাদি পশু নিয়ে উঠে যান ১১,০০০ ফুট উঁচুতে থাকা এই বুগিয়ালে।
- পাহাড়ি বিশ্বাস: সেখানকার পুষ্টিকর ঘাস খেয়ে গবাদি পশু অত্যন্ত স্বাস্থ্যবান হয়ে ওঠে এবং প্রভূত দুধ দেয়।
- উৎসবে প্রত্যাবর্তন: কয়েক মাস ধরে অস্থায়ী তাঁবুতে থেকে পশুদের দেখাশোনা করার পর আগস্ট মাসে যখন পশুপালকেরা গ্রামে ফিরে আসেন, সেই আনন্দকেই উদযাপিত করা হয় আন্দুরি উৎসবের মাধ্যমে।
[উৎসবের আবহ ও পর্যায়ক্রম]
গবাদি পশু নিয়ে দায়ারা বুগিয়ালে পাড়ি (গ্রীষ্মের শুরু)
└── বুগিয়ালের পুষ্টিকর ঘাস গ্রহণ ও সুস্বাস্থ্য লাভ
└── ভাদ্র সংক্রান্তিতে (আগস্ট) বুগিয়াল মাতা ও শ্রীকৃষ্ণের পুজো
└── মাখন দিয়ে দোলখেলা, দই-হাঁড়ি ভাঙা ও লোকনৃত্য
শ্রীকৃষ্ণের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও মাখন খেলা
পুরাণে শ্রীকৃষ্ণ পরিচিত মাখনচোর হিসেবে। তাই গবাদি পশুর সুরক্ষা, দুধ ও মাখনের প্রভূত উৎপাদনের জন্য কৃষ্ণ এবং স্থানীয় ‘বুগিয়াল মাতা’র উদ্দেশ্যে পুজো ও প্রার্থনার মাধ্যমে উৎসবের সূচনা হয়।
লোকগান, নাচ এবং ঐতিহ্যবাহী দই-হাঁড়ি ভাঙার পর শুরু হয় আসল আকর্ষণ। পুজোর পর সবাই একে অপরের মুখে ও গায়ে আনন্দ সহকারে মাখন মাখিয়ে দেন। চোখের নিমেষে দায়ারা বুগিয়ালের গাঢ় সবুজ উপত্যকা পরিণত হয় মাখনের হোলি খেলায়।
প্রাচীন প্রথা ও আধুনিক পর্যটন
আন্দুরি উৎসবের প্রস্তুতি একদিনে শুরু হয় না; কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই স্থানীয় বাসিন্দারা ফুল ও পাহাড়ি সাজসজ্জা দিয়ে নিজেদের বাড়িঘর সাজিয়ে তোলেন।
| সময়কাল ও পরিবর্তন | রীতিনীতি ও বৈচিত্র্য |
| অতীতের রীতি | মাখনের পাশাপাশি গোবর মাখানোর প্রথাও চালু ছিল (যা বর্তমানে বিলুপ্তপ্রায়)। |
| বর্তমান রূপ | মূলত পরিষ্কার মাখন ও দই ব্যবহার করে হোলি খেলা হয়। |
| পর্যটকদের আকর্ষণ | বর্তমানে ট্রেকিং, ক্যাম্পিং ও পাহাড়ি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সুযোগ থাকায় বহু পর্যটক এতে যোগ দেন। |
ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় বিশ্বাস এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের আত্মিক মেলবন্ধনের এক অনুপম উদাহরণ হল এই আন্দুরি উৎসব। হিমালয়ের কোলে মাখন হোলির এই আনন্দ অনুভব করতে প্রতি বছরই বহু অ্যাডভেঞ্চার প্রেমী ও পর্যটক ভিড় জমান দায়ারা বুগিয়ালে।






