রাজনেতাদের ব্যক্তিগত তথ্য হাতাতে ‘হানিট্র্যাপ’! ধৃত জইশ জঙ্গি হামিমের জালে ঝাড়খণ্ডের বাঙালি তরুণী অর্পিতা, বিস্ফোরক তথ্য হাতে পেল STF

পূর্ব বর্ধমানের রেনেসাঁ হাউজিংয়ের জিমে ডাম্বেল তোলার সময় জইশ-ই-মহম্মদ জঙ্গি হামিম মণ্ডলকে তুলে নিয়েছিল বেঙ্গল এসটিএফ (Bengal STF)। আদালতে পেশ করে ১৪ দিনের হেফাজতে নেওয়ার পরই তাকে ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন তদন্তকারীরা। আর তাতেই বেরিয়ে এল আন্তর্জাতিক জঙ্গি মডিউলের এক অদ্ভুত ও বিপজ্জনক চাল— ‘হানিট্র্যাপ’। বঙ্গ রাজনীতিকদের গতিবিধি ও ব্যক্তিগত জীবন নজরদারি করতে এক বাঙালি তরুণীকে ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করছিল এই পাক-মদতপুষ্ট জঙ্গি।
‘অপারেশন হানিট্র্যাপ’: কে এই অর্পিতা সরকার?
তদন্তকারীদের সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, হামিমের প্রধান টার্গেট ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং নগরোন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী উমেশ রাইসহ একাধিক ভিআইপি নেতা।
- কৌশল: সরাসরি নেতাদের কাছে না পৌঁছে অত্যন্ত চতুরতার সাথে ঝাড়খণ্ডের সাহেবগঞ্জ জেলার বারহাওড় এলাকার তরুণী অর্পিতা সরকারকে সামনে নিয়ে আসে হামিম।
- তথ্য সংগ্রহ: অর্পিতার মাধ্যমেই বিভিন্ন প্রভাবশালী নেতার সাথে নিবিড় পরিচিতি গড়ে তোলা হতো। তাঁদের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ, দৈনন্দিন ট্রাভেল রুট ও যাতায়াতের গোপন সময় হামিমের কাছে পৌঁছে দিতেন অর্পিতা।
- হোয়াটসঅ্যাপ নথি উদ্ধার: হামিমের মোবাইল ঘেঁটে অর্পিতার সঙ্গে আদান-প্রদান করা একাধিক সন্দেহজনক হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট ও ছবি ইতিমধ্যেই বাজেয়াপ্ত করেছেন গোয়েন্দারা।
[হামিমের 'হানিট্র্যাপ' নেটওয়ার্কের কার্যকলাপ]
১. এজেন্ট বাছাই: ঝাড়খণ্ডের বারহাওড়ের বাসিন্দা অর্পিতা সরকার।
২. মিশন: প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলা ও ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করা।
৩. যোগাযোগের মাধ্যম: এনক্রিপ্টেড মেসেজ ও হোয়াটসঅ্যাপ অনলাইন চ্যাট।
৪. মূল উদ্দেশ্য: প্রাপ্ত গোপন নথির ওপর ভিত্তি করে হামলার ব্লুপ্রিন্ট ও টাইমলাইন সাজানো।
মন্তেশ্বর থেকে হাওড়া হয়ে বর্ধমান: হামিমের অতীত ইতিহাস
হামিমের পরিবারের পারিবারিক পটভূমিও খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা।
- আদি বাড়ি: পূর্ব বর্ধমানের মন্তেশ্বর থানার দীর্ঘনগর গ্রামে হামিমদের আদি বাড়ি।
- হাওড়ার পাট: ১৯৯৮ সাল থেকে হামিমের বাবা মনিরুদ্দিন মণ্ডল কাজের সূত্রে হাওড়ার পিলখানায় বসবাস শুরু করেন এবং সেখানে এক অবাঙালি মহিলাকে বিয়ে করেন। তাঁদের দুই ছেলে ও এক মেয়ে।
- রেনেসাঁ আস্তানা: প্রায় দু’মাস আগে রেনেসাঁ আবাসনের রোহিনী টাওয়ারে ‘একতা মেহেরা’র একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নেন মনিরুদ্দিন। সেখানে গোটা পরিবার একসাথেই থাকত।
শুক্রবার ওই ফ্ল্যাটে গিয়ে দেখা যায় বাইরে থেকে তালা ঝুলছে। প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, অতি সাধারণ ও ভদ্র পোশাকের আড়ালে প্রতিবেশী যুবকটি যে আন্তর্জাতিক জঙ্গি মডিউল ও হানিট্র্যাপের সাথে যুক্ত ছিল, তা তাঁরা ভাবতেও পারেননি।
জাল আরও বিস্তার করার চেষ্টা এসটিএফের
ঝাড়খণ্ডের ওই তরুণী অর্পিতা সরকার স্বেচ্ছায় এই জঙ্গি চক্রের অংশ হয়েছিলেন, নাকি অজান্তেই তাঁকে ব্ল্যাকমেইল বা ব্যবহার করা হচ্ছিল, তা স্পষ্ট করতে একটি বিশেষ দল ঝাড়খণ্ডের বারহাওড়ে পাঠানো হচ্ছে। একই সাথে উদ্ধার হওয়া ডিজিটাল ডিভাইস ও চ্যাটিং হিস্ট্রি স্ক্যান করে এই হানিট্র্যাপ জালে রাজ্যের আর কোন কোন নেতা পা দিয়েছিলেন, তার তালিকা তৈরি করছে এসটিএফ।
এক নজরে হানিট্র্যাপ তথ্য:
| বিষয় | তথ্য / বিবরণ |
| ধৃত জঙ্গি | হামিম মণ্ডল (সাজ্জাদ ভাট গ্যাং / জইশ-ই-মহম্মদ) |
| হানিট্র্যাপে ব্যবহৃত তরুণী | অর্পিতা সরকার (বারহাওড়, ঝাড়খণ্ড) |
| গ্রেপ্তারের স্থান | রেনেসাঁ হাউজিংয়ের জিম (পূর্ব বর্ধমান) |
| আইনি পদক্ষেপ | ১৪ দিনের এসটিএফ (STF) পুলিশ হেফাজত |
| প্রধান টার্গেট | ভিআইপি রাজনীতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তিত্ব |
একজন সাধারণ জামাকাপড়ের কর্মী কীভাবে সামাজিক মাধ্যমের সুযোগ নিয়ে ঝাড়খণ্ডের তরুণীকে দিয়ে রাজ্যের প্রভাবশালী রাজনীতিকদের ওপর ‘হানিট্র্যাপ’ চালাল, তা এসটিএফের চোখ ছানাবড়া করে দিয়েছে। আগামী ১৪ দিনের হেফাজতে হামিম ও অর্পিতার কথোপকথন ঘেঁটে আরও একাধিক চাঞ্চল্যকর মোড় সামনে আসতে চলেছে বলে মনে করছেন গোয়েন্দারা।






