
ভারতের মতো দেশ রাশিয়া থেকে তেল কিনছে বলেই ইউক্রেনে যুদ্ধ চলছে—এমন যুক্তি দেখিয়ে ভারতের উপর অতিরিক্ত শুল্ক চাপানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এবার ইউক্রেনের মাটিতে দাঁড়িয়েই সেই যুক্তিকে কার্যত খারিজ করে দিলেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শংকর। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে সাক্ষাতের পর জয়শংকর স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, কোন দেশ রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কিনল বা কিনল না, তার সঙ্গে যুদ্ধ থামার সরাসরি কোনও সম্পর্ক নেই। আলোচনার মাধ্যমেই এই সংঘাতের সমাধান সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পশ্চিমের একাধিক দেশ রুশ তেল আমদানি বন্ধ করে দেয়। তবে জার্মানির মতো বেশ কিছু দেশে রুশ গ্যাস আমদানি নিয়ে নির্ভরতা পুরোপুরি শেষ হয়নি। সেই সময় কম দামে রুশ অপরিশোধিত তেল কেনা শুরু করে ভারত। এরপর দ্রুত বাড়তে থাকে রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানির পরিমাণ।
প্রথম থেকেই ভারতের এই সিদ্ধান্ত ভালোভাবে নেয়নি আমেরিকা। তবে নয়াদিল্লির অবস্থান ছিল স্পষ্ট—দেশের ১৪০ কোটি মানুষের জ্বালানির চাহিদা পূরণ এবং জাতীয় স্বার্থের কথা মাথায় রেখে যে উৎস থেকে তেল আমদানি তুলনামূলকভাবে লাভজনক, সেখান থেকেই তেল কেনা হবে।
রুশ তেল কেনাকে কেন্দ্র করে গত বছর আগস্টে ভারতীয় পণ্যের উপর ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপানোর সিদ্ধান্ত নেন ট্রাম্প। তাঁর অভিযোগ ছিল, রুশ তেল বিক্রি করে পাওয়া অর্থ ইউক্রেনে যুদ্ধ চালাতে ব্যবহার করছে মস্কো। সেই কারণেই রুশ তেল আমদানি করা দেশগুলির উপর চাপ বাড়ানোর কথা জানিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ভারতকেও রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়ার কথা প্রকাশ্যে জানিয়েছিলেন তিনি।
এর পাশাপাশি রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলির বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগও নেয় ট্রাম্প প্রশাসন। ‘Sanctioning Russia Act 2025’ নামে প্রস্তাবিত আইনে রাশিয়া থেকে তেল, গ্যাস, ইউরেনিয়াম ও পেট্রোপণ্য কেনা দেশগুলির উপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব রয়েছে। সেই শুল্কের হার সর্বোচ্চ ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে বলেও প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
রুশ তেল আমদানি নিয়ে এর আগেও একাধিকবার ট্রাম্পের অবস্থানের সমালোচনা করেছেন জয়শংকর। এবার ইউক্রেনে গিয়ে তাঁর মন্তব্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকের পর জয়শংকর বলেন, প্রায় পাঁচ বছর ধরে যুদ্ধ চলছে। কিন্তু কোন দেশ তেল বা অন্য কোনও পণ্য কিনল, তার ভিত্তিতে এই সমস্যার সমাধান হবে না। তাঁর মতে, শেষ পর্যন্ত আলোচনার মাধ্যমেই যুদ্ধের সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে হবে।
ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টিও ফের তুলে ধরেছেন বিদেশমন্ত্রী। জয়শংকর মনে করিয়ে দেন, ভারতের মতো বিপুল জনসংখ্যার দেশে ১৪০ কোটি মানুষের জন্য নিরবচ্ছিন্ন শক্তিসম্পদের জোগান নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম দায়িত্ব। তাই আন্তর্জাতিক সংঘাতের পরিস্থিতিতেও ভারতের জাতীয় স্বার্থ এবং জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
জয়শংকরের এই মন্তব্য এমন সময়ে সামনে এল, যখন রুশ তেল কেনা নিয়ে ভারত ও আমেরিকার মধ্যে চাপানউতোর অব্যাহত। একদিকে ইউক্রেন যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার জন্য রাশিয়ার উপর চাপ বাড়াতে চাইছে ওয়াশিংটন, অন্যদিকে ভারত নিজেদের জ্বালানি চাহিদা ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে তেল বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়ার অবস্থান নিয়েছে।
ফলে ইউক্রেনের মাটিতে দাঁড়িয়ে জয়শংকরের বার্তা শুধু যুদ্ধের কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে ভারতের অবস্থানই স্পষ্ট করল না, একইসঙ্গে রুশ তেল আমদানি নিয়ে নয়াদিল্লির দীর্ঘদিনের জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক নীতির কথাও ফের সামনে আনল।






