খাগড়াগড় বিস্ফোরণের ১২ বছর পর ফের বর্ধমানে জঙ্গি ডেরা! নিউটাউন থেকে রেনেসাঁ আবাসন— কীভাবে শুভেন্দু অধিকারীকে রেকি করেছিল ধৃত হামিম?

২০১৪ সালের ২ অক্টোবর। বিস্ফোরণের বিকট শব্দে কেঁপে উঠেছিল বর্ধমানের খাগড়াগড়, যার মধ্য দিয়ে উন্মোচিত হয়েছিল জামাত-উল-মুজাহিদিন (JMB)-এর মতো আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের নেটওয়ার্ক। ঘটনার ঠিক ১২ বছর পর ফের সেই খাগড়াগড় থেকে মাত্র ৪ কিলোমিটার দূরে ঘাঁটি গাড়া এক আন্তর্জাতিক জঙ্গির সন্ধান পেল বেঙ্গল এসটিএফ। অভিজাত রেনেসাঁ আবাসন থেকে ধৃত হামিম মণ্ডলের ছক উন্মোচন হতেই স্পষ্ট হলো— কীভাবে সে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে নিশানা করতে একাধিক কৌশল বদলেছে।
নিউটাউন থেকে শুভেন্দুর রুট রেকি
তদন্তকারীদের সূত্রে জানা গেছে, হাওড়ার পিলখানায় বাবার সঙ্গে গেঞ্জি কারখানায় দর্জির কাজ করা হামিম কিছুদিন আগে পর্যন্ত কলকাতার নিউটাউনে একটি ভাড়া বাড়িতে গিয়ে উঠেছিল। আশ্চর্যজনকভাবে, ওই বাড়িটির খুব কাছেই অবস্থিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বাসভবন।
- নিউটাউনে থাকার সময় প্রতিদিন মুখ্যমন্ত্রী কোন পথ দিয়ে যাতায়াত করছেন, কনভয়ের গতি কেমন থাকে— সে সব বিষয়ে বিস্তারিত রেকি করত হামিম।
- এরপর ছাব্বিশের বিধানসভা ভোটের ফলাফল ঘোষণার পর সে কৌশল বদলে হঠাৎ করেই স্থানান্তরিত হয় বর্ধমানের রেনেসাঁ আবাসনে।
[হামিম মণ্ডলের আস্তানা বদল ও ট্র্যাকিং রুট]
* প্রথম স্থান: পিলখানা, উত্তর হাওড়া (দর্জির পেশায় যুক্ত ছিল)।
* দ্বিতীয় স্থান: নিউটাউন, কলকাতা (শুভেন্দু অধিকারীর বাসভবন সংলগ্ন এলাকা, রেকি করার জায়গা)।
* চূড়ান্ত ঘাঁটি: রেনেসাঁ আবাসন, পূর্ব বর্ধমান (খাগড়াগড় থেকে ৪ কিমি দূরে, জাতীয় সড়কের পাশে)।
প্রতিবেশীদের কাছে ‘সাধারণ ব্যবসায়ী’, নেমপ্লেট একতা মেহেরার
বর্ধমান হাইওয়ের ওপর অবস্থিত রেনেসাঁ হাউসিংয়ে যে ফ্ল্যাটটিতে হামিম থাকত, তার নেমপ্লেটে লেখা রয়েছে ‘একতা মেহেরা’। ওই ফ্ল্যাটের বাসিন্দা শাশ্বতী গঙ্গোপাধ্যায়সহ অন্যান্য প্রতিবেশীরা জানান—
“হামিমকে দেখে অত্যন্ত সাধারণ মনে হতো। স্ত্রী এবং তিন সন্তানকে নিয়ে থাকত সে। কেন হাওড়া ছেড়ে বর্ধমানে এসে ফ্ল্যাট ভাড়া নিল, তা নিয়ে প্রশ্ন করলে ও নিজেকে ব্যবসায়ী বলে পরিচয় দিত। তবে ওর চালচলনে কখনো সন্দেহ করার মতো কিছু পাওয়া যায়নি।”
সাধারণ যুবকদের মগজধোলাই ও আন্তর্জাতিক জাল
বৃহস্পতিবার গ্রেপ্তারের পর হামিমের কাছে থাকা একটি উচ্চপ্রযুক্তির মোবাইল ফোন বাজেয়াপ্ত করেছে বেঙ্গল এসটিএফ। গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন, হামিম ছিল কাশ্মীরের কুখ্যাত ‘সাজ্জাদ ভাট’ গোষ্ঠীর কট্টর সদস্য।
পূর্ব ভারতে যুবকদের কট্টরপন্থী তৈরি করা ও মগজধোলাই করার দায়িত্ব ছিল হামিমের কাঁধে। সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে মূলত বিরিয়ানি ব্যবসায়ী, সবজি বিক্রেতা ও দরিদ্র যুবকদের টার্গেট করত এই নেটওয়ার্ক। উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা ও রাজস্থানের মতো রাজ্যে ছড়িয়ে থাকা এই ভয়ংকর গ্যাংয়ের সঙ্গে হামিমের নেটওয়ার্ক ঠিক কতদূর বিস্তৃত, তা খতিয়ে দেখতে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ চালানো হচ্ছে।
এক নজরে খাগড়াগড় ও বর্ধমানের ঘটনাপ্রবাহ:
| বিষয় | তথ্য / বিবরণ |
| ঐতিহাসিক পটভূমি | ২০১৪ সালের ২ অক্টোবর (খাগড়াগড় বিস্ফোরণ) |
| বর্তমান ঘটনা | খাগড়াগড় থেকে ৪ কিমি দূরে রেনেসাঁ আবাসন থেকে হামিম গ্রেপ্তার |
| মুখ্যমন্ত্রীর ওপর নজরদারি | নিউটাউনে ভাড়া থেকে শুভেন্দু অধিকারীর রুট রেকি |
| ছদ্মবেশ | ব্যবসায়ী পরিচয়, স্ত্রী ও তিন সন্তানসহ পরিবার গড়ে তোলা |
| প্রধান চক্র | সাজ্জাদ ভাট গ্যাং (জইশ-ই-মহম্মদ নেটওয়ার্ক) |
১২ বছর আগের খাগড়াগড় কাণ্ড বাংলায় যে সতর্কতার বার্তা দিয়েছিল, তা যে আজও কতটা প্রাসঙ্গিক, হামিম মণ্ডলের গ্রেপ্তারিতে তা ফের প্রমাণিত হলো। নিউটাউন থেকে বর্ধমান— শুভেন্দু অধিকারীকে নিশানা করতে সাধারণ পরিবারের আড়ালে হামিমের এই ছদ্মবেশী কৌশল আন্তর্জাতিক জঙ্গি মডিউলের ভয়াবহ গভীরতাকেই নির্দেশ করে।






