Kolkata Taratala Building Collapse: তারাতলায় হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ল নির্মীয়মাণ ইমারত, ধ্বংসস্তূপ থেকে ৩ জনের দেহ উদ্ধার, নিখোঁজ বহু

সূত্র:
সংবাদ প্রতিদিন
কলকাতার তারাতলা এলাকায় এক মর্মান্তিক ও ভয়াবহ বহুতল বিপর্যয়ের সাক্ষী থাকল শহরবাসী। বুধবার ব্রেসব্রিজের কাছে একটি নির্মীয়মাণ তিনতলা ইমারত তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। এই ঘটনায় অন্তত ৩ জনের মৃত্যুর খবর মিলেছে। ঘটনার তীব্রতা এতটাই বেশি যে, যুদ্ধকালীন তৎপরতায় বিপর্যয় মোকাবিলা দল (NDRF), পুলিশ ও সেনাবাহিনীর জওয়ানরা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছেন। এই ঘটনার পর থেকেই এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়েছে এবং নির্মাণের গুণগত মান নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, তারাতলার ব্রেসব্রিজের কাছে কলকাতা বন্দর কর্তৃপক্ষের ৬৬৮৯ বর্গমিটার জমি ৩০ বছরের জন্য লিজে নিয়েছিল মেসার্স বেহেরা ব্রাদার্স নামে একটি সংস্থা। সংস্থার পক্ষে শম্ভুনাথ বেহেরা এই কাজের দায়িত্বে ছিলেন। ২০২৪ সালের আগস্ট মাস থেকে এই লিজের মেয়াদ শুরু হয়। শর্ত অনুযায়ী, এই জমিতে একটি গুদাম ঘর ও হিমঘর তৈরির কাজ চলছিল।
অভিযোগ, অত্যন্ত দুর্বল ভিতের ওপর কোনওরকমে লোহার বিম খাড়া করে এই তিনতলা ভবনটি তৈরি করা হচ্ছিল। বুধবার সকাল থেকেই দোতলা ও তিনতলায় কংক্রিট ঢালাইয়ের কাজ শুরু হয়। কিন্তু এই বিপুল পরিমাণ কংক্রিটের ওজনকে ধরে রাখার মতো ক্ষমতা ছিল না কাঠামোটির। ইস্পাতের শেডের ওপর অতিরিক্ত ভারী কংক্রিটের ঢালাইয়ের চাপ নিতে না পেরে লোহার বিমগুলি বাঁকতে শুরু করে এবং দুপুরের দিকে বিকট শব্দে সম্পূর্ণ ভবনটি ভেঙে পড়ে। দোতলার কাজের দায়িত্বে থাকা আসগর নামে এক ঠিকাদার ঘটনার পর থেকেই নিখোঁজ রয়েছেন।
দুর্ঘটনার পর ধ্বংসস্তূপের চেহারা দেখে উদ্ধারকারী কর্মীরাও রীতিমতো হতবাক হয়ে যান। দেখা যায়, তাড়াহুড়ো করে কাজ শেষ করার চক্করে সুরক্ষাবিধি সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করা হয়েছিল। লোহার বিমের শক্তি পরীক্ষা না করেই ঢালাইয়ের কাজ করা হচ্ছিল।
ভয়াবহ এই ঘটনার খবর পেয়ে দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছন স্থানীয় ৮০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আনোয়ার খান। তিনি কলকাতা বন্দরের বিধায়ক তথা কলকাতার প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিমের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত। তবে কাউন্সিলর এলাকায় পৌঁছনো মাত্রই সাধারণ মানুষের তীব্র ক্ষোভের মুখে পড়েন। অভিযোগ, তাঁর মদতেই এই এলাকায় নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে বেআইনিভাবে এই নির্মাণকাজ চলছিল। ক্ষুব্ধ জনতা আনোয়ার খানকে তাড়া করে এলাকা থেকে বার করে দেয়।
লিজ নেওয়া জমিতে বেহেরা ব্রাদার্স যে হিমঘরটি বানাচ্ছিল, তা নিয়ে স্থানীয় স্তরে আগেই ক্ষোভ ছিল। অভিযোগ, স্থানীয় প্রভাবশালী তৃণমূল নেতাদের একাংশের মদতে পুরসভার নজরদারির তোয়াক্কা না করেই দ্রুত গতিতে এই বিপজ্জনক নির্মাণ খাড়া করা হচ্ছিল। যার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে বুধবার এই মর্মান্তিক বিপর্যয় নেমে এল।
দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর এক সাংবাদিক বৈঠকে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, এই ইমারতটি কলকাতা পুরসভার আবাসন বিভাগের অনুমোদিত ছিল। তবে এটি বর্তমান সরকারের আমলে নয়, বরং পূর্বতন সরকারের জমানায় ২০২৬ সালের ১৭ জানুয়ারি অনুমোদন পেয়েছিল। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “ভেঙে পড়া বিল্ডিংয়ের নকশাটি অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ ছিল এবং সেই কারণেই এত বড় বিপর্যয় ঘটেছে।” এর পাশাপাশি আপাতত ওই জায়গায় সমস্ত ধরণের নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
কলকাতায় এর আগেও বেআইনি ও দুর্বল বহুতল ভেঙে পড়ার ঘটনা ঘটেছে। তারাতলার এই বিপর্যয় প্রমাণ করে দিল যে, বড় বড় বাণিজ্যিক বা পরিকাঠামোগত নির্মাণের ক্ষেত্রেও কীভাবে পুরসভা ও বন্দর কর্তৃপক্ষের নজরদারির অভাব থেকে যাচ্ছে। প্রভাবশালীদের মদতে নকশার তোয়াক্কা না করে তৈরি হওয়া এই বহুতলগুলি যে কত বড় বিপদের কারণ হতে পারে, এই ঘটনা তার জলজ্যান্ত প্রমাণ।
তারাতলার ব্রেসব্রিজের এই বহুতল দুর্ঘটনা কলকাতার নির্মাণ পরিকাঠামোর ওপর আবারও এক বড়সড় ধাক্কা। ৩ জনের প্রাণহানির পর প্রশাসন নড়েচড়ে বসলেও, প্রশ্ন উঠছে দোষীদের শাস্তি নিয়ে। লিজ নেওয়া সংস্থা এবং এই দুর্নীতির পেছনে থাকা প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ না করা হলে, আগামী দিনে এই ধরণের বিপর্যয় এড়ানো অসম্ভব বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।






