তামিলনাড়ু সরকারের বড় ধাক্কা! করুর পদপিষ্ট কাণ্ডে মৃতদের পরিবারকে চাকরি দেওয়ার সিদ্ধান্তে মাদ্রাজ হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ

তামিলনাড়ুর নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর সি জোসেফ বিজয়ের নেওয়া অন্যতম বড় জনকল্যাণমূলক সিদ্ধান্ত বড়সড় আইনি ধাক্কার মুখে পড়ল। ৯ মাস আগে করুরে রাজনৈতিক সমাবেশে ভয়াবহ পদপিষ্টের ঘটনায় নিহতদের স্বজনদের সরকারি চাকরি দেওয়ার যে ঘোষণা রাজ্য সরকার দিয়েছিল, তা অসংবিধানিক ঘোষণা করে স্থগিতাদেশ দিল মাদ্রাজ হাইকোর্ট।
সংবিধানের ১৪ ও ১৬ নম্বর অনুচ্ছেদ লঙ্ঘনের অভিযোগ, কী বলল হাইকোর্ট?
সোমবার এই সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে মাদ্রাজ হাইকোর্টের বিচারপতি সি ভি কার্তিকেয়ন এবং বিচারপতি আর শক্তিভেল-এর সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ কড়া পর্যবেক্ষণ ব্যক্ত করেন।
আদালতের তরফে জানানো হয়, করুণা বা সহানুভূতির ওপর ভিত্তি করে সাংবিধানিক নিয়ম অগ্রাহ্য করে সরকারি চাকরি বণ্টন করা যায় না।
“নিয়ম না মেনে ৪১ জন মৃতের পরিবারকে চাকরি দেওয়ার সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ অবৈধ। ভারতীয় সংবিধানে বর্ণিত ১৪ এবং ১৬ নম্বর অনুচ্ছেদ সরকারি চাকরিতে রাজ্যের সমস্ত নাগরিককে সমান সুযোগের নিশ্চয়তা দেয়। নিয়ম বহির্ভূতভাবে চাকরি দিলে সাধারণ চাকরিপ্রার্থীদের অধিকার খর্ব হয়।”
[মাদ্রাজ হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণের মূল নির্দেশিকা]
* অবৈধ ঘোষণা: অনুচ্ছেদ ১৪ ও ১৬ লঙ্ঘনের কারণে চাকরির বিজ্ঞপ্তি ও নিয়োগ বেআইনি।
* আইনি সমতা: সরকারি নিয়োগে নির্দিষ্ট নিয়মাবলী ও সকল নাগরিকের সমান সুযোগ বাধ্যতামূলক।
* মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বনাম সংবিধান: মানবিক কারণ দেখালেও সংবিধানের মূল কাঠামো লঙ্ঘন করা যাবে না।
ঘটনার নেপথ্য: করুর ট্র্যাজেডি ও বিজয়ের নিয়োগপত্র প্রদান
ঘটনার সূত্রপাত গত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর। তামিলনাড়ুর করুরে টিভিকে (TVK) প্রধান সি জোসেফ বিজয়ের এক বিশাল জনসভা চলাকালীন চরম বিশৃঙ্খলা ও ভিড়ের চাপে পদপিষ্টের ঘটনা ঘটে। ওই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ৪১ জনের মৃত্যু হয় এবং বহু মানুষ মারাত্মকভাবে জখম হন। ঘটনার পর সভার প্রস্তুতি ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার ঘাটতি নিয়ে একাধিক প্রশ্ন ওঠে।
পরবর্তীকালে মে মাসে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী পদে আসীন হওয়ার পর, গত ১০ জুলাই প্রথম সরকারি সফরে করুর যান বিজয়। সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির জন্য ১০ লক্ষ টাকার আর্থিক সাহায্য এবং পরিবারপিছু একটি করে সরকারি চাকরির কথা ঘোষণা করা হয়। তিনি নিজেই ৩১টি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের প্রতিনিধির হাতে স্কুল, রাজস্ব দপ্তর ও গ্রামীণ উন্নয়ন দপ্তরের অধীনে জুনিয়ার অ্যাসিস্ট্যান্ট, অফিস অ্যাসিস্ট্যান্ট ও ওয়াচম্যানের মতো অস্থায়ী পদের নিয়োগপত্র তুলে দেন।
বিরোধীদের তীব্র আক্রমণ ও আইনি লড়াই
রাজ্য সরকারের এই পদক্ষেপে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে আদালতের দ্বারস্থ হন প্রধান বিরোধী দল এআইএডিএমকে (AIADMK)-র প্রবীণ নেতা আর বি উদয়কুমার।
তাঁর অভিযোগ ছিল, তামিলনাড়ুর লক্ষ লক্ষ তরুণ-তরুণী দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করে সরকারি চাকরির পরীক্ষায় বসছেন। কোনো আইনি প্রক্রিয়া বা পরীক্ষা ছাড়া রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এভাবে চাকরি বণ্টন করা রাজ্যের যুবসমাজের প্রতি চরম প্রতারণা। উদয়কুমার জানান, আদালতের এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত রাজ নীতিতে ভুল দৃষ্টান্ত স্থাপন করা থেকে রাজ্যকে রক্ষা করল।
এক নজরে করুর মামলা ও আইনি নির্দেশ:
| বিষয়ের ক্ষেত্র | বিস্তারিত বিবরণ |
| মূল ঘটনা | ২৫ সেপ্টেম্বর করুরে টিভিকে রাজনৈতিক সমাবেশে পদপিষ্ট হয়ে ৪১ জনের মৃত্যু। |
| সরকারের পদক্ষেপ | ১০ লক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্য ও ৩১টি পরিবারকে অস্থায়ী সরকারি চাকরির নিয়োগপত্র প্রদান। |
| হাইকোর্টের রায় | সংবিধানের ১৪ ও ১৬ নম্বর অনুচ্ছেদ লঙ্ঘনের অভিযোগে নিয়োগপত্রের ওপর স্থগিতাদেশ। |
| ডিভিশন বেঞ্চ | বিচারপতি সি ভি কার্তিকেয়ন ও বিচারপতি আর শক্তিভেল। |
ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হওয়া পরিবারগুলির প্রতি সহানুভূতি দেখালেও আইনের শাসন এবং সংবিধানের নীতি রক্ষাকেই অগ্রাধিকার দিল মাদ্রাজ হাইকোর্ট। এই রায়ের ফলে বিজয় সরকারের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ওপর বড়সড় প্রশ্ন চিহ্ন দাঁড়িয়ে গেল, যা আগামী দিনে তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে চলেছে।






