“ওরাও মানুষ, সম্মানের অধিকার রয়েছে!” সমকামী ও রূপান্তরকামীদের সমর্থনে সওয়াল আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতের, মনে করালেন সনাতন ধর্মের প্রাচীন ঐতিহ্য

source : সংবাদ প্রতিদিন
লিঙ্গসাম্য ও যৌন পরিচয়ের অধিকার নিয়ে দেশজুড়ে চলা আলোচনার মাঝেই এক তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করলেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (RSS) সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত। এলজিবিটিকিউ+ (LGBTQ+) সম্প্রদায়ের মানুষদের সমাজ থেকে আলাদা না করে, তাঁদের সনাতন সংস্কৃতি ও মূল সামাজিক স্রোতের অংশ হিসেবে মেনে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন তিনি।
“সমাজ থেকে এদের একঘরে করা ভুল”— সঙ্ঘপ্রধানের বড় বার্তা
রবিবার হায়দরাবাদে এক বিশেষ আলোচনা সভায় এলজিবিটিকিউ+ সম্প্রদায় সম্পর্কিত প্রশ্নের মুখে পড়েন আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত।
উত্তরে তিনি বলেন—
“এলজিবিটিকিউ+ সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব ভারতীয় সমাজে চিরকাল রয়েছে। কাউকেই তো প্রকৃতি এইভাবে তৈরি করেছে, আবার কারও মানসিকতা এমন। এরা চিরকাল ছিল। আমাদের সমাজে নীরবে এদের জন্য কাজও হয়েছে। যেভাবেই হোক, যাঁরা এই ধরনের মানুষ, তাঁরাও মানুষ। তাঁদের বেঁচে থাকার অধিকার এবং সম্মানের অধিকার রয়েছে। সমাজ থেকে এদের একঘরে করা উচিত নয়; সামাজিক জীবনের বিশাল পরিসরে তাঁদের নির্দিষ্ট স্থান রয়েছে।”
কুম্ভমেলা থেকে ইতিহাস: ভারতীয় ঐতিহ্যে এলজিবিটিকিউ+ স্থান
সনাতন হিন্দু ধর্মে এই সম্প্রদায়ের গ্রহণযোগ্যতা তুলে ধরে ভাগবত জানান, ভারতীয় সমাজ অতীতে কখনই তাঁদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করেনি, বরং চিরকাল একটি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছে।
ভাগবত আরও যোগ করেন—
“আমাদের ধর্মে ওদের নিজস্ব দেব-দেবী রয়েছেন, নিজস্ব মন্দির রয়েছে। এমনকী কুম্ভমেলাতেও অংশ নেন তাঁদের মহামণ্ডলেশ্বররা। ফলে এই বিষয়টি নিয়ে অহেতুক চেঁচামেচি বা বিতর্ক না করে প্রয়োজনীয় উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, যা অতীতেও আমরা করে এসেছি।”
[আরএসএস ও এলজিবিটিকিউ+ সংক্রান্ত সংক্ষিপ্ত টাইমলাইন]
* ২০১৮: ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা বাতিল করে প্রাপ্তবয়স্কদের সমকামী সম্পর্ককে অপরাধমুক্ত করার রায়কে স্বাগত জানায় আরএসএস।
* ২০২৩: এক সাক্ষাৎকারে মোহন ভাগবত পুরাণ ও ঐতিহ্যের উল্লেখ করে সমকামীদের প্রতি সামাজিক অন্তর্ভুক্তির কথা বলেন।
* ২০২৬ (সাম্প্রতিক): হায়দরাবাদের মঞ্চ থেকে সমকামী ও রূপান্তরকামীদের মৌলিক অধিকার ও সম্মানের পক্ষে স্পষ্ট সওয়াল।
২০২৩-এর পুনরাবৃত্তি ও সমলিঙ্গের বিয়ে প্রসঙ্গে সতর্ক অবস্থান
তবে আরএসএস প্রধানের এমন বক্তব্য এবারই প্রথম নয়। ২০২৩ সালেও এক সাক্ষাৎকারে তিনি মহাভারত ও পৌরাণিক প্রসঙ্গের অবতারণা করে বলেছিলেন, ভারতীয় সভ্যতা এই সম্প্রদায়কে কখনও বর্জন করেনি।
উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্ট যখন সংবিধানের ৩৭৭ ধারা বাতিল করে সমকামী সম্পর্ককে বৈধতা দেয়, তখন আরএসএস রায়টিকে সমর্থন জানিয়েছিল। তবে সমলিঙ্গের বিবাহকে (Same-Sex Marriage) আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার ইস্যুতে এখনও কিছুটা সতর্ক ও সনাতনী সামাজিক ভারসাম্য রক্ষার পক্ষেই অবস্থান সঙ্ঘের।
এক নজরে মোহন ভাগবতের মন্তব্যের সারসংক্ষেপ:
| বিষয়বস্তু | আরএসএস প্রধানের অবস্থান |
| সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা | এরা সমাজের বিচ্ছিন্ন কেউ নন, সমাজেরই অঙ্গ। |
| মৌলিক অধিকার | আত্মসম্মান ও অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকার পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে। |
| ঐতিহাসিক ভিত্তি | সনাতন সংস্কৃতি ও হিন্দু পুরাণে এদের অস্তিত্ব স্বীকৃত। |
| আইনি দৃষ্টিভঙ্গি | ৩৭৭ ধারা রদে সমর্থন, তবে সমলিঙ্গের বিবাহে সতর্ক নজর। |
মোহন ভাগবতের এই বক্তব্য বর্তমান সময়ের সামাজিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সমাজের মূলধারায় এলজিবিটিকিউ+ সম্প্রদায়কে অন্তর্ভুক্ত করার এবং তাঁদের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলের ক্ষেত্রে আরএসএস প্রধানের এই বক্তব্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।






