Nepal Flash Flood: হড়পা বানে নিখোঁজ বাংলার পর্যটক ও কর্মীরা, ডিএনএ পরীক্ষার অপেক্ষায় পরিবার

‘আদৌ কি ফিরবেন তাঁরা?’—এই প্রশ্নটাই এখন তাড়া করে বেড়াচ্ছে নেপালের ভয়াবহ হড়পা বানের পর নিখোঁজ হয়ে যাওয়া বাংলার পর্যটক ও কর্মীদের পরিবারকে। সাত দিন পেরিয়ে গিয়েছে। কারও বাবা, কারও মা, কারও স্ত্রী, কারও ভাই কিংবা সন্তান—প্রিয়জনের কোনও খোঁজ না মেলায় উৎকণ্ঠা ক্রমশ বাড়ছে।
স্বজনদের অনেকেই এখনও মানতে নারাজ যে তাঁদের আপনজন আর নেই। কেউ হাসপাতালে খুঁজছেন, কেউ কাঠমান্ডুতে পৌঁছে আহত ও নিহতদের তালিকা খতিয়ে দেখছেন। আবার কেউ অপেক্ষা করছেন ডিএনএ পরীক্ষার জন্য। নেপাল প্রশাসনের তরফে নিখোঁজ পর্যটকদের আত্মীয়দের ডিএনএ নমুনা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
‘এত দিনে একবারও যোগাযোগ করত না?’
পশ্চিম মেদিনীপুরের খড়্গপুরের প্রেমবাজারের বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত রেলকর্মী স্বপন সিনহা ২৫ অগস্টের পর থেকেই নিখোঁজ। তাঁর ছেলে অর্ণব ও মিলন একদিকে নেপালে থাকা ভারতীয় দূতাবাসে, অন্যদিকে কলকাতার ভবানী ভবনে যোগাযোগ করছেন। মঙ্গলবার খড়্গপুরের এসডিপিও-র সঙ্গেও দেখা করে ডিএনএ পরীক্ষার বিষয়ে জানতে চান তাঁরা। পুলিশ জানিয়েছে, এখনও সরকারি ভাবে এই বিষয়ে কোনও নির্দেশিকা আসেনি।
মিলনের কথায়, ‘এত দিনে কি একবারও যোগাযোগ করত না?’ বাবার কোনও খবর না পাওয়ার যন্ত্রণা ক্রমেই অসহ্য হয়ে উঠছে তাঁদের কাছে।
মানসরোবর থেকে আর ফেরেননি রিনা
কলকাতার নেতাজিনগরের বাসিন্দা গুঞ্জা মুখোপাধ্যায়ের একমাত্র বোন ৫২ বছরের রিনা বন্দ্যোপাধ্যায় একাই মানসরোবর বেড়াতে গিয়েছিলেন। যাওয়ার আগে কথা দিয়েছিলেন, পবিত্র মানসরোবরের জল নিয়ে ফিরবেন।
কিন্তু এখনও তাঁর কোনও খোঁজ নেই। বাড়িতে রয়েছেন ৮৪ বছরের বৃদ্ধা মা। গুঞ্জা জানিয়েছেন, মাকে এখনও কিছু জানানো হয়নি। রিনার ৭ সেপ্টেম্বর ফেরার কথা ছিল।
‘ডিএনএ টেস্টের জন্য অপেক্ষা করছি’
বৈষ্ণবঘাটা-পাটুলি টাউনশিপের অমরনাথ পালের পরিবারও একই অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। তাঁর মেয়ে রূপমা জানিয়েছেন, দিনের পর দিন একই প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে তাঁরা ক্লান্ত। এখনও বাবার কোনও সন্ধান মেলেনি। এখন তাঁদের একমাত্র অপেক্ষা ডিএনএ পরীক্ষার জন্য।
পর্ণশ্রীর রঞ্জিত কুমার হাওলাদারের মেয়ে সুনন্দাও একইভাবে অপেক্ষা করছেন। কর্মসূত্রে মুম্বইয়ে থাকা সুনন্দা বাবার নিখোঁজ হওয়ার খবর পেয়ে কলকাতায় চলে এসেছেন। তাঁর মা হৃদ্রোগের সমস্যায় ভুগছেন এবং ছেলের খবর না পেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
সুনন্দার কথায়, এতদিন পর জীবিত থাকার সম্ভাবনা নিয়ে বাস্তবতার প্রশ্ন থাকলেও মন এখনও কোনও ‘মিরাকল’-এর আশায় রয়েছে।
স্ত্রী লোপামুদ্রার খোঁজে শুভ্রজিৎ
দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুরের সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার লোপামুদ্রা কুণ্ডুরও কোনও খোঁজ নেই। তাঁর স্বামী শুভ্রজিৎ সিনহা রায় জানিয়েছেন, ২১ অগস্ট লোপামুদ্রা বেড়াতে গিয়েছিলেন। ২৬ অগস্ট চিন সীমান্তে থাকার কথা জানিয়েছিলেন। এরপর আর যোগাযোগ হয়নি।
শুভ্রজিৎ জানিয়েছেন, প্রয়োজন হলে তিনিও নেপালে যেতে পারেন। স্ত্রী কোনও হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন কি না, সেই আশাও এখনও ছাড়তে পারেননি তিনি।
অস্ট্রেলিয়া থেকে কাঠমান্ডুতে ছেলে
উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাটের শিক্ষক দম্পতি স্বপন ও মৌ মণ্ডলের খোঁজে অস্ট্রেলিয়া থেকে কাঠমান্ডুতে পৌঁছেছেন তাঁদের একমাত্র ছেলে উষ্ণীষ। বাবা-মায়ের সন্ধানে দুর্গত এলাকায় হেলিকপ্টারে যাওয়ার ইচ্ছা রয়েছে তাঁর বলে জানিয়েছেন প্রতিবেশী কমল মুখোপাধ্যায়।
বাবা-মায়ের খোঁজে হাসপাতাল থেকে দুর্গত এলাকা—সব জায়গাতেই ছুটে বেড়াচ্ছেন তিনি।
শর্মিষ্ঠার খোঁজে অপেক্ষা শুভ্রাংশুর
নিখোঁজদের তালিকায় রয়েছেন প্রয়াত তৃণমূল নেতা মুকুল রায়ের পুত্রবধূ শর্মিষ্ঠা ভৌমিক রায়ও। তাঁর স্বামী শুভ্রাংশু রায় এখনও আশায় রয়েছেন। আপাতত রাজ্য সরকারের উপরেই ভরসা রাখছেন তিনি এবং এখনই নেপালে যাওয়ার পরিকল্পনা নেই বলে জানা গিয়েছে।
মাকে খুঁজতে আমেরিকা ও বেঙ্গালুরু থেকে ছেলেরা
হুগলির সিঙ্গুরের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা শিপ্রা রায় পাটারি একাই বেড়াতে গিয়েছিলেন। অসুস্থতার কারণে স্বামী রবীন পাটারি তাঁর সঙ্গে যেতে পারেননি।
শিপ্রার ছেলে নিলয় আমেরিকায় থাকেন। মায়ের নিখোঁজ হওয়ার খবর পেয়ে সোমবার চন্দননগরের বাড়িতে ফিরে এসেছেন তিনি। বেঙ্গালুরু থেকে ছোট ছেলে অনীকও বাড়িতে ফিরেছেন। নেপালে তাঁদের পরিচিতজন রয়েছেন। বুধবার দু’জনেই নেপালে ছুটে গিয়েছেন। তাঁদের বিশ্বাস, মা হয়তো কোনও হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।
পর্যটক নন, নিখোঁজ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মীরাও
শুধু পর্যটকরাই নন, নেপালের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কাজ করা বাংলার কয়েকজন কর্মীরও এখনও কোনও সন্ধান নেই।
বাঁকুড়ার ইন্দপুরের অশোক পাল নেপালের একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করতেন। তাঁর বোন কবিতা দাসের বাড়ি বর্ধমান শহর সংলগ্ন লাকুর্ডিতে। বর্তমানে সেখানেই রয়েছেন অশোকের বাবা-মা। তাঁর স্ত্রী জবাও দু’বছরের সন্তানকে নিয়ে বীরভূমের মল্লারপুর থেকে এসে রয়েছেন।
পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, অশোকের নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে তাঁর বোন কবিতা বারবার অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।
বর্ধমানের দেওয়ানদিঘির বাসিন্দা ৪৩ বছরের সন্দীপ গড়াইও নেপালের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে স্টোরকিপার হিসেবে কাজ করতেন। রাসুয়ায় হড়পা বানের পর থেকেই তাঁর কোনও সন্ধান নেই। তাঁর স্ত্রী তিথি এখনও কোনও নিশ্চিত খবর পাননি। ছোট ছেলেকে নিয়ে কীভাবে সংসার চালাবেন, সেই চিন্তাতেও ভেঙে পড়েছেন তিনি।
দুর্গাপুরের দুই দম্পতি ও উত্তরপাড়ার দম্পতিও নিখোঁজ
দুর্গাপুরের অম্বুজানগরীর দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর স্ত্রী সঙ্ঘমিত্রা বন্দ্যোপাধ্যায়েরও কোনও খোঁজ নেই। তাঁদের মেয়ে ও জামাই মঙ্গলবার কাঠমান্ডুতে পৌঁছেছেন। এর আগে দেবাশিসের ভাই ও শ্যালকও নেপালে গিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে তাঁদের খোঁজ করেছেন।
একইভাবে বামুনাড়া এলাকার মৌসুমি গঙ্গোপাধ্যায় ও তাঁর স্বামী অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায় এবং শ্রীনগরপল্লির বাসিন্দা সুভাষচন্দ্র ঘোষেরও সন্ধান মেলেনি।
হুগলির উত্তরপাড়ার ক্ষিতীশ ও মমতা বিশ্বাসও নিখোঁজ। তাঁদের বাড়িতে এখন তালা ঝুলছে। জানা যায়, তাঁদের একমাত্র মেয়ে ১৮ বছর বয়সে পথ দুর্ঘটনায় মারা যান। এরপর থেকেই পুজো-আচ্চা ও ভ্রমণ নিয়েই জীবন কাটাচ্ছিলেন তাঁরা।
‘মিরাকল’-এর আশায় স্বজনরা
একদিকে দিন গড়াচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে সংশয়। সাত দিন ধরে কোনও যোগাযোগ না থাকায় স্বাভাবিকভাবেই আশঙ্কা বাড়ছে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে। তবুও বহু মানুষ এখনও হাল ছাড়তে রাজি নন।
কেউ হাসপাতালের তালিকায় খুঁজছেন প্রিয়জনকে, কেউ কাঠমান্ডুর পথে, কেউ অপেক্ষা করছেন ডিএনএ পরীক্ষার জন্য। বাস্তবতা যতই কঠিন হোক, স্বজনদের মনে এখনও একটাই আশা—হয়তো কোনও অলৌকিক ঘটনা ঘটবে। হয়তো প্রিয় মানুষটি কোথাও বেঁচে আছেন।
কারণ, প্রিয়জনকে হারানোর নিশ্চিত প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত আশা ছেড়ে দেওয়া যে কতটা কঠিন, নেপালের বিপর্যয়ের পর বাংলার একাধিক পরিবারের চোখে-মুখে এখন তারই ছবি।






