এনআরএসে নার্সের রহস্যমৃত্যুতে ফেন্টানিল ইঞ্জেকশন উদ্ধার! লালবাজারের জালে স্বামী ও সহকর্মীরা?

কলকাতার অন্যতম প্রধান সরকারি হাসপাতাল নীলরতন সরকার (NRS) মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে ডিউটি চলাকালীন এক কর্মঠ নার্সের আকস্মিক ও রহস্যজনক মৃত্যুতে তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি ও স্বাস্থ্যমহল। স্ত্রীরোগ বিভাগের এইচডিইউ (HDU)-তে কর্মরত ৩০ বছর বয়সী ওই নার্সের দেহ বাথরুমের দরজা ভেঙে উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া ক্যানসারের মারণ যন্ত্রণা স্তিমিত করার অতি কড়া ডোজের এনাস্থেটিক ওষুধ ‘ফেন্টানিল’ ঘটনাটিকে এক চরম রহস্যের মোড়ে এনে দাঁড় করিয়েছে।
ডিউটির মাঝেই উধাও, বাথরুম ভেঙে উদ্ধার দেহ
বুধবার রাত ৮টায় ডিউটি শুরু করেছিলেন পূর্ব মেদিনীপুরের বাসিন্দা ওই তরুণী নার্স। ওয়ার্ডে রোগীদের ভিড়ের মাঝেই কাজ করতে করতে বাথরুমে যান তিনি। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ না ফেরায় এক জুনিয়র রেসিডেন্ট চিকিৎসক প্রথম বিষয়টি লক্ষ্য করেন। বাথরুম ভেতর থেকে বন্ধ থাকায় এবং ভিতর থেকে সাড়া না মেলায় গ্রুপ-ডি কর্মচারীদের ডেকে দরজা ভাঙা হয়। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. শারদ্বত মুখোপাধ্যায় হাসপাতালে গিয়ে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে জানান, “ওঁকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে মৃত্যুর কারণ অত্যন্ত সন্দেহজনক, পুলিশ বিজ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে সঠিক তদন্তের পথেই এগোবে।”
[ঘটনা ও তদন্তের মূল আপডেট]
* প্রাপ্ত সামগ্রী: ৩টি ফেন্টানিল ভায়াল (৬ মিমি) ও একটি ইঞ্জেকশন সিরিঞ্জ।
* ক্ষতচিহ্ন: মৃতার কনুইয়ের সংযোগস্থলে সুচের স্পষ্ট দাগ।
* ময়নাতদন্তের স্থান: নিরপেক্ষতার স্বার্থে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ।
* পুলিশি আইনি মামলা: রহস্যমৃত্যু মামলা রুজু, শুক্রবার ৪ জন নার্সকে লালবাজারে তলব।
কেন ও কীভাবে কনুইয়ে ফুটল ফেন্টানিল?
পুলিশ তদন্তে উঠে এসেছে যে, উদ্ধার হওয়া ওষুধটি সাধারণ সিডেটিভ নয়— এটি ক্যানসার রোগীদের তীব্র যন্ত্রণা উপশমে ব্যবহৃত ‘ফেন্টানিল’ (Fentanyl)। সাধারণত একজন রোগীকে সর্বোচ্চ ২ মিলিলিটার দেওয়া হয়, কিন্তু সেখানে ৬ মিলিলিটার অর্থাৎ তিন-তিনটে খালি ভায়াল মিলেছে।
এখন প্রশ্ন উঠছে—
- নার্স কি নিজেই কড়া ডোজের এই ওষুধ নিজের শরীরে প্রয়োগ করেছেন, নাকি অন্য কেউ ফুটিয়েছে?
- তিনি কি নিয়মিত এটি সেবন করতেন, নাকি বিষণ্ণতা বা ভুলের বশে এত বড় পদক্ষেপ নিলেন?
পারিবারিক টানাপোড়েন ও পণের চাপ?
মৃতার বাবা ও পরিবারের বয়ানে বেশ কিছু অসঙ্গতি ধরা পড়েছে, যা লালবাজারের গোয়েন্দাদের ভাবিয়ে তুলছে। কয়েক বছর আগে ফেসবুকের মাধ্যমে পরিচয় ও প্রেমের পর বিয়ে হলেও সংসারে অশান্তি ছিল কি না, পণের জন্য কোনও চাপ দেওয়া হতো কি না— সবটাই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মৃতার বাবার দাবি, “মেয়ে মারা যাওয়ার রাতে জামাই সাড়ে এগারোটা নাগাদ ফোন করে বলে মেয়ে বেঁচে নেই, আবার পরক্ষণেই বলে আইসিইউতে রাখা আছে।” অন্যদিকে স্বামী দাবি করেছেন, মেট্রোতে থাকায় সন্ধ্যায় স্ত্রীর সাথে বেশিক্ষণ কথা বলতে পারেননি।
এক নজরে এনআরএস নার্স রহস্যমৃত্যু ঘটনা:
| বিষয় | বিবরণ / তথ্য |
| মৃতার পরিচয় | এনআরএস হাসপাতালের স্ত্রীরোগ বিভাগের ৩০ বর্ষীয় নার্স (মূল বাড়ি: পূর্ব মেদিনীপুর) |
| উদ্ধার হওয়া ড্রাগ | ফেন্টানিল (Fentanyl) – ক্যানসারের কড়া এনাস্থেটিক ও সিডেটিভ ওষুধ |
| তদন্তে লালবাজার | মোবাইল বাজেয়াপ্ত, সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও ৪ জন নার্সকে তলব |
| স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য | “মৃত্যুর কারণ সন্দেহজনক, সরকার বিজ্ঞানের ভিত্তিতে সত্য সামনে আনবে” |
কলকাতার বুকে সরকারি হাসপাতালের ভেতরে ক্যানসারের মতো জটিল রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধের ওভারডোজ এবং একজন নার্সের রহস্যমৃত্যু নানা সুরক্ষাজনিত প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং বাজেয়াপ্ত ফোনের কল ডিটেইলস হাতে এলেই ঘটনার আসল সত্য উন্মোচিত হবে বলে আশা লালবাজারের তদন্তকারীদের






