‘সন্ধ্যা ৭:৪৫-এ বৃষ্টি আর মেট্রোর কথা বলেছিল, তারপর সব শেষ!’ মুখ খুললেন স্বামী রাহুল, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট দেখেই এফআইআর-এর সিদ্ধান্ত

নীলরতন সরকার (NRS) মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের গাইনি বিভাগের এইচডিইউ-তে কর্মরত নার্স রূপালি বর্মনের (৩০) আকস্মিক ও রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা রূপ নিয়েছে এক জটিল ধোঁয়াশায়। কীভাবে এক তরতাজা প্রাণ হাসপাতালে ডিউটিতে যোগ দেওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নিভে গেল, তা বুঝে উঠতে পারছেন না স্বজনরা। এবার এই পুরো ঘটনার বিষয়ে মুখ খুলেছেন মৃতার স্বামী রাহুল দাস।
‘মেট্রোতে ছিল, বলেছিল বৃষ্টি পড়ছে’— শেষ ফোনালাপে কী কথা হয়েছিল?
বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত তথা ওয়ার্ক ফ্রম হোম করা রাহুল দাস জানান, বুধবার রাত ৮টার শিফটে ডিউটি ছিল রূপালির। তার ঠিক কিছুক্ষণ আগে, অর্থাৎ সন্ধ্যা ৭টা ৪৫ মিনিট নাগাদ স্ত্রীর সঙ্গে শেষ বার কথা হয় তাঁর।
রাহুল বলেন:
“খুব বেশিক্ষণ কথা বলা যায়নি। কারণ ও তখন মেট্রোয় ছিল। বৃষ্টি পড়ছে জানিয়ে বলেছিল পরে কথা বলবে। কথা একদম স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু হাসপাতালে যাওয়ার পর হঠাৎ কী ঘটে গেল, তা আমি এখনও বুঝে উঠতে পারছি না।”
৩ বছর আগে আইনি বিয়ে সারলেও চলতি ২০০৬ সালের মার্চ মাসেই সামাজিক আয়োজনের মাধ্যমে চার হাত এক হয়েছিল রাহুল ও রূপালির। স্ত্রীর এই আকস্মিক বিয়োগে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছেন তিনি।
[ঘটনার সময়রেখা ও স্বামীর অবস্থান]
* সন্ধ্যা ৭:৪৫ – স্বামীর সঙ্গে মেট্রো থেকে রূপালির শেষ ফোনালাপ।
* রাত ৮:০০ – এনআরএসের গাইনি বিভাগে এইচডিইউ-তে নাইট ডিউটিতে যোগ দেওয়া।
* রাত ১০:২০ – শৌচাগারে প্রবেশ এবং দীর্ঘক্ষণ না বেরোনোয় দরজা ভেঙে অচৈতন্য উদ্ধার।
* আইনি পদক্ষেপ – এনআরএসে ময়নাতদন্ত বাতিল, মেডিক্যাল কলেজের রিপোর্ট দেখেই লিখিত অভিযোগ।
এনআরএসে ময়নাতদন্তে কেন অনিচ্ছা? রিপোর্ট দেখে অভিযোগের ভাবনা
হাসপাতাল চত্বরে এমন একটি অঘটন ঘটে যাওয়ায় এনআরএস কর্তৃপক্ষের ওপর ভরসা রাখতে পারেননি পরিবার। রাহুল স্পষ্ট জানান, “যেখানে এমন একটা ঘটনা ঘটেছে, সেখানে আমরা ময়নাতদন্ত করাতে চাইনি।”
স্বামীর এই ইচ্ছাকে মান্যতা দিয়েই স্বাস্থ্য ভবনের হস্তক্ষেপে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের মর্গে ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করা হয়। তবে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট থেকে মৃত্যুর আসল আভাস বা কারণ পাওয়ার পরই থানায় লিখিত অভিযোগ জানাবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন রাহুল।
ফেন্টানিলের ভায়াল ও অচৈতন্য উদ্ধার: পুলিশের তদন্ত
হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, রাত ৮টায় ডিউটিতে যোগ দিয়ে ভর্তি থাকা রোগীদের পরিষেবা দেন রূপালি। এরপর রাত ১০টা ২০ মিনিট নাগাদ তিনি শৌচাগারে যান।
অনেকক্ষণ সাড়াশব্দ না পাওয়ায় গ্রুপ-ডি কর্মীকে দিয়ে শৌচাগারের দরজা ভাঙা হলে ভেতরে অচৈতন্য অবস্থায় পাওয়া যায় তাঁকে, পাশে পড়ে ছিল তাঁর মোবাইল ফোন।
ঘটনাস্থল থেকে ফেন্টানিলের (Fentanyl) ৩টি ভায়াল উদ্ধার হয়েছে, যা মূলত অস্ত্রোপচার ও তীব্র ব্যথা কমানোর শক্তশালী ওপিওইড পেনকিলার (Opioid Painkiller)। প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী অতিরিক্ত ওষুধ প্রয়োগে মৃত্যু হলেও, দেহে কোনও সুইসাইড নোট না মেলায় পুলিশ এখনই এটিকে আত্মহত্যা বলতে নারাজ।
এক নজরে রাহুল দাসের বয়ান ও বর্তমান পরিস্থিতি:
| বিষয় | বিবরণ / তথ্য |
| মৃতার পরিচয় | রূপালি বর্মন (৩০), এনআরএস হাসপাতালের HDU নার্স |
| স্বামী | রাহুল দাস (বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত, ডব্লিউএফএইচ) |
| বিয়ের তথ্য | ৩ বছর আগে আইনি বিয়ে, ২০২৬ সালের মার্চে সামাজিক অনুষ্ঠান |
| বর্তমান আইনি অবস্থান | ময়নাতদন্তের রিপোর্ট মেলার পর অভিযোগ দায়েরের সিদ্ধান্ত |
| তদন্তকারী দল | কলকাতা পুলিশ ও স্বাস্থ্য দপ্তরের যৌথ তদন্ত কমিটি |
স্বামীর বয়ান ও প্রাথমিক তথ্যের পর এই রহস্যের কেন্দ্রবিন্দু এখন একটাই— ফেন্টানিল ইনজেকশনের ৩টি ভায়াল কীভাবে রূপালির কাছে এল এবং এটি দুর্ঘটনাবশত অতিরিক্ত ওষুধ প্রয়োগ নাকি অন্য কোনও রহস্য। কলকাতা মেডিক্যালের ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্ট ও পুলিশের তদন্তই দেবে এই সমস্ত প্রশ্নের আসল জবাব।






