Unsung Boxing Legend Kaur Singh: বক্সিং রিংয়ে মহম্মদ আলির মুখোমুখি হওয়া একমাত্র ভারতীয়! পদ্মশ্রী পেয়েও শেষ জীবনে মেলেনি সরকারি সাহায্য, চিনে নিন বিস্মৃত বক্সার কৌর সিংহকে

source : আনন্দবাজার
ভারত কেবল সংস্কৃতিরই দেশ নয়, খেলাধুলারও দেশ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বিশ্বের দরবারে যাঁরা দেশের নাম উজ্জ্বল করছেন, তাঁরা কি আমাদের থেকে আদৌ যোগ্য সম্মান পান? আদতে বেশির ভাগের কথাই ইতিহাসের পাতায় থেকে যায়, মানুষের মন থেকে তাঁরা মুছে যান। পঞ্জাবের কউর সিংহ তেমনই এক অনামী মুষ্টিযোদ্ধা। ভারতের স্পোর্টস হিস্ট্রির অন্যতম গৌরবময় কিন্তু ট্র্যাজিক এক চরিত্রের নাম কউর সিংহ, যিনি দেশের একমাত্র বক্সার হিসেবে বিশ্বখ্যাত মহম্মদ আলির চোখের চোখ রেখে রিংয়ে লড়েছিলেন।
১৯৭১-এর যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ১৯৮২-এর এশিয়ান গেমসের স্বর্ণপদক
১৯৪৮ সালে পঞ্জাবের খানাল খুর্দ গ্রামের এক সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্ম কউর সিংহের। জীবনের শুরুর দিনগুলো চাষাবাদ করে কাটলেও, তাঁর ভাগ্য বদলে যায় ১৯৭১ সালে। ২৩ বছর বয়সে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে হাবিলদার পদে যোগ দেন তিনি। যোগদানের পরপরই শুরু হয় ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ। রণক্ষেত্রে অসামান্য সাহসিকতা দেখানোর জন্য কউরকে ‘সেনা পদক’ দিয়ে সম্মানিত করা হয়।
সেনাবাহিনীতে থাকাকালীনই কউরের বক্সিংয়ের প্রতি ভালোবাসা জন্মায়। সাধারণত তিরিশের দোরগোড়ায় এসে যেখানে বক্সাররা গ্লাভস তুলে রাখার কথা ভাবেন, সেখানে ২৯ বছর বয়সে ১৯৭৭ সালে বক্সিং রিংয়ে হাতেখড়ি হয় কউরের। কিন্তু নিজের প্রখর মেধার জোরে মাত্র ২ বছরের মধ্যে (১৯৭৯ সালে) তিনি জাতীয় স্তরে হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন হন। এরপর ১৯৮০ সালে এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে সোনা এবং ১৯৮২ সালে দিল্লির এশিয়ান গেমসে সোনা জিতে দেশকে গর্বিত করেন। খেলাধুলোয় এই অনন্য অবদানের জন্য সরকার তাঁকে ‘অর্জুন পুরস্কার’ এবং ১৯৮৩ সালে ‘পদ্মশ্রী’ সম্মানে ভূষিত করে। ১৯৮৪ সালে লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক্সেও দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন তিনি।

দিল্লির রিংয়ে মহম্মদ আলি বনাম কউর সিংহ: ইতিহাসের সেই ৫০ হাজার সাক্ষী
কউর সিংহের বক্সিং ক্যারিয়ারের সেরা ম্যাচটি কোনো অলিম্পিক্স বা এশিয়ান গেমসের মঞ্চে হয়নি। সেটি ঘটেছিল ১৯৮০ সালে, দিল্লির এক ঐতিহাসিক প্রদর্শনী ম্যাচে। বিশ্ব কাঁপানো মার্কিন হেভিওয়েট বক্সার মহম্মদ আলি (Muhammad Ali) তখন ভারত সফরে এসেছিলেন। ভারতের কোনো বক্সারই সেদিন আলির সামনে রিংয়ে নামার সাহস পাচ্ছিলেন না।
সেদিন এগিয়ে এসেছিলেন কেবল পঞ্জাবের কউর সিংহ। দিল্লির সেই রিংয়ে মহম্মদ আলির পঞ্চের মুখে দাঁড়িয়ে শেষ রাউন্ড পর্যন্ত লড়ে গিয়েছিলেন কউর। স্টেডিয়ামে উপস্থিত প্রায় ৫০ হাজার দর্শক সেদিন এক ভারতীয় জওয়ানের অপরাজেয় মানসিকতার সাক্ষী হয়েছিলেন। ম্যাচটিতে কউর হারলেও, মহম্মদ আলির মতো কিংবদন্তিকে কড়া টক্কর দিয়ে তিনি ভারতের বক্সিং ইতিহাসে অমর হয়ে যান।

[পদ্মশ্রী কউর সিংহের গৌরবময় ক্যারিয়ার ও লাইফলাইন]
* জন্ম: ১৯৪৮ সাল, খানাল খুর্দ গ্রাম, পঞ্জাব।
* ১৯৭১: ভারতীয় সেনায় যোগদান ও ভারত-পাক যুদ্ধে সেনা পদক লাভ।
* ১৯৮০: দিল্লিতে কিংবদন্তি মহম্মদ আলির বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক লড়াই।
* ১৯৮২: দিল্লির এশিয়ান গেমসে হেভিওয়েট বক্সিংয়ে স্বর্ণপদক জয়।
* ১৯৮৩: ভারত সরকার কর্তৃক ‘পদ্মশ্রী’ ও ‘অর্জুন পুরস্কার’ লাভ।
* ২০২৩ (এপ্রিল): ৭৪ বছর বয়সে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত।
লাইমলাইট থেকে দূরে এক কৃষকের নিঃশব্দ প্রস্থান
১৯৮৪ অলিম্পিক্সের পর বক্সিং থেকে অবসর নেন কউর। অবসর নেওয়ার পরই তাঁর জীবন ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে যায়। গ্ল্যামার আর জনপ্রিয়তার আলো থেকে পুরোপুরি উধাও হয়ে তিনি ফিরে যান পঞ্জাবের সেই প্রত্যন্ত গ্রামে। অলিম্পিয়ান ও পদ্মশ্রী বক্সার হাত তুলে নেন সেই পুরনো কাস্তে-লাঙলে, শুরু করেন সাধারণ কৃষকের জীবন।
ট্র্যাজেডি নেমে আসে যখন কয়েক বছর পর কউর মারাত্মক হৃদ্রোগে আক্রান্ত হন। চিকিৎসকরা জানান তাঁর বুকে স্টেন্ট বসাতে হবে। কিন্তু পকেটে টাকা না থাকায় এই আন্তর্জাতিক তারকা নিজের চিকিৎসাটুকু করাতে পারছিলেন না। যে সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী দিয়েছিল, আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সেই সরকারের তরফ থেকে কোনো আর্থিক সাহায্য পাননি কউর।
শেষ সময়ে তাঁর পাশে এসে দাঁড়ায় তাঁর পুরনো মাতৃসম প্রতিষ্ঠান ভারতীয় সেনা। সেনা তাঁর চিকিৎসার সিংহভাগ দায়িত্ব নেয়। পরবর্তীতে বলিউডের বাদশা শাহরুখ খান (Shah Rukh Khan) এবং ‘বক্সিং ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়া’ (BFI)-ও কউরের চিকিৎসার জন্য বড় অঙ্কের আর্থিক সাহায্য পাঠায়।

এক নজরে অনামী মেডেলজয়ী কউর সিংহ:
| বিষয়ের ক্ষেত্র | কিংবদন্তি বক্সারের জীবনের খতিয়ান |
| নাম ও জন্মস্থান | কউর সিংহ (খানাল খুর্দ, পঞ্জাব)। |
| সেনা জীবন | ১৯৭১ ভারত-পাক যুদ্ধের বীর জওয়ান (সেনা পদক জয়ী)। |
| ঐতিহাসিক কৃতিত্ব | মহম্মদ আলির বিরুদ্ধে রিংয়ে নামা একমাত্র ভারতীয় বক্সার। |
| সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান | পদ্মশ্রী (১৯৮৩) এবং অর্জুন পুরস্কার (১৯৮২)। |
| বায়োপিক ও সম্মান | পঞ্জাবি সিনেমা ‘পদ্মশ্রী কউর সিংহ’ (২০২২) এবং স্কুলের পাঠ্যক্রমে জীবনী (২০২৩)। |
দীর্ঘদিন রোগভোগের পর ২০২৩ সালের এপ্রিলে ৭৪ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই মহান অ্যাথলেট। মৃত্যুর ঠিক আগে ২০২২ সালে পঞ্জাবি পরিচালক বিক্রম প্রধান তাঁর জীবনসংগ্রামের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করেন বায়োপিক ‘পদ্মশ্রী কউর সিংহ’। ২০২৩ সালে পঞ্জাব সরকার তাঁদের এই বীরের জীবন কাহিনী স্কুলের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করে, যাতে নতুন প্রজন্ম এই বিস্মৃত হিরোকে ভুলে না যায়। কউর সিংহ আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু দিল্লির রিংয়ে মহম্মদ আলির সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো তাঁর সেই ছবি ভারতীয় ক্রীড়াজগতের ইতিহাসে চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।






