কবিগুরুর পায়ের ধুলো পড়েছিল যে রাজবাড়িতে, সেখানেই আজও ধুমধাম করে দুর্গাপুজো

রাজপাট নেই, নেই সেই পুরনো জৌলুসও। কিন্তু ঐতিহ্যে একটুও ভাটা পড়েনি। কয়েক শতাব্দী আগে যে রাজবাড়িতে পায়ের ধুলো পড়েছিল কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের, আজও সেখানে একই নিষ্ঠায় পালিত হয় দুর্গাপুজো। একাধিক সিনেমা ও ছবির শুটিংয়ের জন্য পরিচিত সেই ঐতিহাসিক সুরুল সরকারবাড়ি দুর্গোৎসবের সময় যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়।
বীরভূমের সুরুলের এই পুজো শুধু একটি পরিবারের উৎসব নয়। দীর্ঘ ইতিহাস, আচার-অনুষ্ঠান এবং গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে রয়েছে এই দুর্গাপুজো। পুজোর কয়েকদিন সুরুল সরকারবাড়িকে ঘিরে বসে জমজমাট মেলা। নাটমন্দিরে চলে যাত্রাপালা। দেশ-বিদেশের পর্যটকদের আনাগোনায় মুখর হয়ে ওঠে গোটা এলাকা।
কীভাবে শুরু সুরুলের দুর্গাপুজো?
কাহিনি ফিরে যায় অষ্টাদশ শতকে। বর্ধমানের বাঁকা নদীর তীরে নীলপুরে বসবাস করতেন ভরতচন্দ্র ঘোষ নামে এক ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি। তাঁর কোনও সন্তান ছিল না। স্ত্রীকে নিয়ে বারাণসীতে তীর্থযাত্রার উদ্দেশ্যে বেরিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু মাঝপথে সেই যাত্রা আর এগোয়নি। তাঁরা এসে পৌঁছন বীরভূমের সুরুলে।
সেখানে গুরুদেব বাসুদেব ভট্টাচার্যের বাড়িতে আশ্রয় নেন ভরতচন্দ্র ও তাঁর স্ত্রী। ওই বাড়িতে নিয়মিত শ্যামসুন্দরের পুজো হত। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতে থাকেন ভরতচন্দ্র। লোককথা অনুযায়ী, তাঁর প্রার্থনায় সাড়া মেলে। তাঁদের ঘর আলো করে জন্ম নেয় পুত্রসন্তান—কৃষ্ণহরি দাস।
পরবর্তী সময়ে কৃষ্ণহরি সরকার অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে মাটির ঠাকুরদালান তৈরি করে দুর্গাপুজোর আয়োজন করেন। সেখান থেকেই সূচনা সুরুল সরকারবাড়ির দুর্গোৎসবের। সময়ের সঙ্গে এই পুজো ছড়িয়ে পড়ে গোটা এলাকায় এবং আজ তা বীরভূমের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী পুজো হিসেবে পরিচিত।
ব্যবসায় সমৃদ্ধি, তৈরি হয় প্রাসাদ
কৃষ্ণহরি সরকারের পৌত্র শ্রীনিবাস সরকার পরবর্তীতে পুরনো মাটির ঠাকুরদালানের জায়গায় তৈরি করেন প্রাসাদসম অট্টালিকা এবং তার সঙ্গে খিলানযুক্ত পাকা ঠাকুরদালান। সেই সময়েই সরকার পরিবারের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি চরমে পৌঁছয়।
ফরাসি ও ইংরেজ কুঠিয়ালদের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যে যুক্ত ছিলেন পরিবারের সদস্যরা। নীলচাষের পাশাপাশি চিনি ও কাপড় তৈরিও ছিল তাঁদের ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সেই ঐশ্বর্যের ছাপ এখনও দেখা যায় রাজবাড়ির স্থাপত্য ও পুজোর আয়োজনে। বেলজিয়াম থেকে আনা হয়েছিল বিভিন্ন রঙের ঝাড়বাতি। আজও পুজোর সময় ঠাকুরদালান ও নাটমন্দিরে রেড়ির তেলে জ্বলা সেই ঝাড়বাতিগুলি দেখা যায়। আধুনিক বৈদ্যুতিক আলোর সঙ্গে পুরনো তেলের ঝাড়বাতির সহাবস্থান রাতের রাজবাড়িকে আরও রহস্যময় ও মোহময় করে তোলে।
একই কাঠামোয় তৈরি হয় প্রতিমা
সুরুল সরকারবাড়ির দুর্গাপুজোর অন্যতম বিশেষত্ব প্রতিমা তৈরির রীতিতেও। রথের দিন ঠাকুরদালানে কাঠামো পুজোর মাধ্যমে শুরু হয় প্রতিমা নির্মাণ। প্রতি বছর সেই একই কাঠামোয় নতুন করে মাটি লাগিয়ে প্রতিমা তৈরি করেন শিল্পী।
ছাঁচে তৈরি হয় না প্রতিমা। শিল্পী নিজের হাতে গড়ে তোলেন দেবীর মুখ। ষষ্ঠীর দিন হয় বোধন। সপ্তমীর সকালে পালকিতে করে নবপত্রিকাকে নিয়ে যাওয়া হয় বড় নতুন পুকুরে স্নানের জন্য। স্নান শেষে নবপত্রিকা ফিরে এলে হয় দেবীর চক্ষুদান।
ভোগে থাকে বিপুল আয়োজন
দুর্গাপুজোর দিনগুলিতে দেবীকে নিবেদন করা হয় নানা ধরনের অন্নভোগ। লুচি, তরকারি, সুজি থেকে শুরু করে কদমা, মিহিদানা, বোঁদে, রসগোল্লা, পান্তুয়া, নারকেল নাড়ু এবং বিভিন্ন ফল থাকে ভোগের তালিকায়।
তবে পুজোর অন্যতম পুরনো রীতির মধ্যে রয়েছে বলি। সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী—তিন দিনই বলির আয়োজন হয়। সপ্তমীতে চালকুমড়ো, অষ্টমীতে পাঁঠা এবং নবমীতে চালকুমড়ো ও আখ বলি দেওয়া হয়।
এই পুজোর একটি বিশেষ রীতি হল পাঁঠাবলির সময় নারায়ণের স্থান পরিবর্তন করা হয়। বহু প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই আচারের আজও কোনও ছেদ পড়েনি।
দশমীতে রাজকীয় বিসর্জন
দশমীর সকালেও থাকে বিশেষ আয়োজন। প্রথমে হয় অপরাজিতা পুজো। এরপর মশাল জ্বালিয়ে দুর্গামূর্তিকে নিয়ে যাওয়া হয় কালীসায়রের দিকে। সঙ্গে থাকে ঢাকের বাদ্যি, আর ফাটতে থাকে আতসবাজি।
কালীসায়রে রাজকীয় মর্যাদায় দেবীর বিসর্জন সম্পন্ন হয়। সেই মুহূর্তে উৎসবের আবহে ভরে ওঠে গোটা এলাকা। বিসর্জনের পর ফের শুরু হয় অপেক্ষা—আরও একটি বছর পেরিয়ে আবার মা আসবেন।
শুটিং থেকে পর্যটন—সারা বছরই আকর্ষণ
সুরুল সরকারবাড়ির স্থাপত্য এবং ঐতিহাসিক পরিবেশ দীর্ঘদিন ধরেই সিনেমা ও বিভিন্ন ছবির শুটিংয়ের জন্য আকর্ষণের কেন্দ্র। সারা বছরই এখানে শুটিংয়ের আনাগোনা দেখা যায়। দুর্গাপুজোর সময় সেই ভিড় আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
ঠাকুরদালান ও নাটমন্দিরে তখন শুধু স্থানীয় মানুষ নন, দেশ-বিদেশের পর্যটকরাও ভিড় করেন। পুজোর ইতিহাস, প্রাচীন স্থাপত্য এবং পুরনো আচার কাছ থেকে দেখতেই বহু মানুষ ছুটে আসেন সুরুলে।
কীভাবে যাবেন?
হাওড়া থেকে গণদেবতা এক্সপ্রেস বা শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেসে পৌঁছনো যায় শান্তিনিকেতনে। সেখান থেকে টোটো, রিকশা কিংবা গাড়িতে সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায় সুরুল সরকারবাড়িতে।
রাজপাট হারিয়েছে, সময় বদলেছে, কিন্তু সুরুল সরকারবাড়ির দুর্গাপুজোর ঐতিহ্য বদলায়নি। শতাব্দী পেরিয়েও একই নিয়মে দেবীর আরাধনা, পুরনো আচার, তেলের ঝাড়বাতির আলো এবং বিসর্জনের রাজকীয় আয়োজন—সব মিলিয়ে আজও বীরভূমের মাটিতে নিজের স্বতন্ত্র ইতিহাস বহন করে চলেছে সুরুল সরকারবাড়ির দুর্গোৎসব।






