US Attacks Iran Hormuz Strait 2026: শান্তিচুক্তি ভেঙে হরমুজে জাহাজে হামলা ইরানের! ভোর থেকে পাল্টা ধারাবাহিক বোমাবর্ষণ আমেরিকার, বাতিল তেল বিক্রির ছাড়পত্র

source : সংবাদ প্রতিদিন
মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি স্থাপনের আশা জাগিয়ে গত মাসে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে যে ঐতিহাসিক যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তা এক মাসের মধ্যেই খড়কুটোর মতো উড়ে গেল। হরমুজ প্রণালীতে (Strait of Hormuz) আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর ইরানের নতুন করে আগ্রাসনের জেরে তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠেছে ওয়াশিংটন। আর কোনো রকম হুঁশিয়ারি না দিয়ে, সরাসরি ইরানের মাটিতে ধারাবাহিক ও বিধ্বংসী সামরিক হামলা শুরু করেছে মার্কিন ফৌজ। বুধবার ভোররাত থেকে ইরানের একাধিক সামরিক ও উপকূলীয় ঘাঁটি লক্ষ্য করে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আছড়ে পড়ছে বলে নিশ্চিত করেছে দুই দেশেরই সংবাদমাধ্যম।
ভোররাত থেকে ইরানের ৩ শহরে মার্কিন বোমাবর্ষণ: গুঁড়িয়ে গেল ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি
বুধবার সকালে সোশ্যাল মিডিয়ায় এক বিবৃতিতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (US Central Command) ইরানের ওপর এই ধারাবাহিক হামলার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে। মার্কিন সেনার তরফে জানানো হয়েছে, হরমুজ প্রণালীতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যতরীর ওপর সম্পূর্ণ অন্যায়, বিপজ্জনক এবং অযৌক্তিক হামলা চালিয়েছে ইরান, যা যুদ্ধবিরতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আর তার জেরেই ইরানকে কড়া শিক্ষা দিতে এই সামরিক অভিযান।
ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বুধবার ভোর থেকে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে একাধিক শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গিয়েছে। মার্কিন যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্রের মূল লক্ষ্য ছিল—
- বন্দর আব্বাস (Bandar Abbas): ইরানের প্রধান নৌঘাঁটি এবং উপকূলীয় নজরদারি ব্যবস্থা।
- সিরিক (Sirik) ও কেশম (Qeshm): বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্র।
- উপকূলীয় ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি: জাহাজ-বিধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ ও লঞ্চ প্যাডগুলো এই হামলায় ধ্বংস করা হয়েছে।
পাল্টা হিসেবে তেহরান ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে একতরফাভাবে চুক্তি ভঙ্গের পাল্টা অভিযোগ এনেছে।
২৪ ঘণ্টায় ৩ জাহাজে হামলা! কেন খেপল আমেরিকা?
উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরানোর লক্ষ্যে গত মাসে দুই দেশের মধ্যে যে মউ (MoU) স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তার অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল— আগামী ৬০ দিন হরমুজ প্রণালী দিয়ে সমস্ত দেশের বাণিজ্যিক জাহাজ সম্পূর্ণ নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারবে।
কিন্তু সেই চুক্তিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে গত সোমবার হরমুজে দুটি আন্তর্জাতিক জাহাজ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরানের ‘রেভোলিউশন গার্ড’ (Iran’s Revolutionary Guard)। এর ঠিক ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মঙ্গলবার আরও একটি বাণিজ্যতরী লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। পরপর তিনটি জাহাজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরই মার্কিন প্রশাসন চরম সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
[আমেরিকা-ইরান সমঝোতা ও বর্তমান সংঘাতের টাইমলাইন]
* গত মাস: দীর্ঘ যুদ্ধের পর আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর, নিষেধাজ্ঞা শিথিল।
* চুক্তি শর্ত: ২১ আগস্ট পর্যন্ত ইরানকে তেল বিক্রির ছাড় এবং ৬০ দিন হরমুজে জাহাজে হামলা না করার প্রতিশ্রুতি।
* এই সপ্তাহের সোমবার-মঙ্গলবার: হরমুজ প্রণালীতে পরপর ৩টি বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা।
* বুধবার ভোর: ইরানের বন্দর আব্বাস, সিরিক ও কেশমে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের ধারাবাহিক হামলা।
* অর্থনৈতিক প্রভাব: ইরানের তেল বিক্রির ছাড়পত্র বাতিল; বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি।
বাতিল হলো তেল বিক্রির ছাড়পত্র, বিশ্ববাজারে তেলের বাজারে আগুন!
আমেরিকার এই সামরিক হামলা শুধু ইরানের সামরিক ঘাঁটিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, ইরানের অর্থনীতির ওপরও বড় কোপ বসিয়েছে হোয়াইট হাউস। চুক্তি অনুযায়ী, ইরানের ওপর থেকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আংশিক তুলে নিয়ে আগামী ২১ আগস্ট পর্যন্ত অপরিশোধিত তেল ও সংশ্লিষ্ট জ্বালানি পণ্য বিশ্ববাজারে উৎপাদন ও বিক্রির ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু হরমুজের হামলার পরেই মার্কিন প্রশাসন সেই বাণিজ্যিক ছাড়পত্র অবিলম্বে প্রত্যাহার বা বাতিল করে দিয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। আমেরিকার এই ঘোষণার সাথে সাথেই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের (Crude Oil) দাম ফের হু হু করে বাড়তে শুরু করেছে, যা বিশ্বজুড়ে নতুন করে মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা তৈরি করছে।
এক নজরে মার্কিন-ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতি ২০২৬:
| বিষয়ের ক্ষেত্র | বর্তমান যুদ্ধের স্থিতি ও ক্ষয়ক্ষতি |
| আক্রমণকারী পক্ষ | মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (US Army)। |
| আক্রান্ত অঞ্চল | দক্ষিণ ইরানের সিরিক, কেশম এবং বন্দর আব্বাস। |
| মার্কিন হামলার মূল লক্ষ্য | ড্রোন কেন্দ্র, এয়ার ডিফেন্স, উপকূলীয় রাডার ও জাহাজ-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি। |
| ইরানের অপরাধ | চুক্তি ভেঙে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হরমুজ প্রণালীতে ৩টি জাহাজে বোমাবর্ষণ। |
| অর্থনৈতিক কোপ | ইরানের তেল বিক্রির অনুমতি বাতিল; বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি। |
গত মাসের চুক্তি ভাঙার পর আমেরিকা ও ইরানের এই নতুন সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যকে আবারও এক দীর্ঘস্থায়ী এবং ভয়াবহ যুদ্ধের মুখে ঠেলে দিল। হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথ যদি ইরানের হামলার কারণে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে, তবে তা বিশ্ব বাণিজ্যের কোমর ভেঙে দেবে। এখন দেখার, মার্কিন এই ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাবে ইরানের রেভোলিউশন গার্ড পাল্টা কোনো বড় সামরিক পদক্ষেপ নেয় নাকি তেহরান আন্তর্জাতিক মহলের মধ্যস্থতায় ফের আলোচনার টেবিলে ফেরে।






