
৯/১১ জঙ্গি হামলার ২৫ বছর পরেও সেই ভয়াবহ হামলাকে ঘিরে বিতর্ক থামছে না। এবার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক তদন্তে সৌদি যোগ নিয়ে নতুন করে চাঞ্চল্যকর দাবি সামনে এসেছে। রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, ৯/১১ হামলার অন্যতম অভিযুক্ত সৌদি নাগরিক আল বায়ুমি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যপ্রমাণ এফবিআইয়ের হাতে থাকা সত্ত্বেও তাঁর সম্ভাব্য ভূমিকা এবং সৌদি যোগ নিয়ে যথাযথ তদন্ত করা হয়নি।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকায় ভয়াবহ জঙ্গি হামলা চালায় আল কায়দা। চারটি যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করে হামলা চালানো হয়েছিল। এর মধ্যে দুটি বিমান আছড়ে পড়ে নিউ ইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ারে। আর একটি বিমান আঘাত করে পেন্টাগনে। চতুর্থ বিমানটি পেনসিলভেনিয়ায় ভেঙে পড়ে।
হামলার সঙ্গে যুক্ত ১৯ জন ছিনতাইকারীর মধ্যে সৌদি নাগরিক নওয়াফ আল-হাজমি এবং খালিদ আল-মিধারও ছিলেন। বিবিসির রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, আমেরিকায় তাঁদের থাকার ব্যবস্থা করতে সাহায্য করেছিলেন আল বায়ুমি। তাঁদের জন্য বাড়ি ভাড়া নেওয়া এবং বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করার অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে।
আল বায়ুমি ১৯৯৪ সালে সৌদি আরব থেকে আমেরিকার সান দিয়েগোতে যান। তাঁর দাবি ছিল, ইংরেজি শেখার জন্যই তিনি আমেরিকায় এসেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী তদন্তে তাঁর আমেরিকায় আসার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগ, পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি ধর্মীয় কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ধীরে ধীরে আল কায়দার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ তৈরি হয়।
সম্প্রতি বিবিসির তরফে প্রকাশ করা বেশ কিছু পুরনো ভিডিওও এই বিতর্ককে নতুন করে উসকে দিয়েছে। ১৯৯৭-৯৮ সালে ধারণ করা একটি ভিডিওতে আল বায়ুমিকে আল কায়দার নেতা আনোয়ার আল-আওলাকির সঙ্গে পেইন্টবল খেলার মাধ্যমে যুদ্ধের মহড়া দিতে দেখা যায় বলে দাবি করা হয়েছে। তাঁদের সঙ্গে সৌদি আরবের ইসলামিক বিষয়ক মন্ত্রকের এক আধিকারিকও ছিলেন বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
আর একটি ভিডিওতে বায়ুমি ও আওলাকিকে একে অপরকে আলিঙ্গন করতে দেখা যায়। এসব ভিডিওকে আল কায়দার সঙ্গে বায়ুমির ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের সম্ভাব্য প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
সবচেয়ে বড় চাঞ্চল্যকর দাবি উঠেছে একটি বিমানের নকশা ঘিরে। বিবিসির রিপোর্ট অনুযায়ী, আল বায়ুমির কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া জিনিসপত্রের মধ্যে একটি বিমানের ডায়াগ্রাম পাওয়া গিয়েছিল। সেখানে ককপিটে কীভাবে প্রবেশ বা সেটি ভাঙা যায়, তার হিসাব-নিকাশ ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। ৯/১১ হামলার পর এফবিআই এই তথ্য সংগ্রহ করেছিল বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে, এত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যপ্রমাণ হাতে থাকার পরেও কেন তা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হয়নি? বিবিসির দাবি, বায়ুমি সম্পর্কে সংগৃহীত তথ্যপ্রমাণ এফবিআইয়ের নিউ ইয়র্ক অফিসে পাঠানো হলেও তা সান দিয়েগো এবং লস অ্যাঞ্জেলেসের সংশ্লিষ্ট দফতরে পাঠানো হয়নি। এমনকি বায়ুমির সঙ্গে যোগাযোগ থাকা সৌদি সরকারি আধিকারিকদের জিজ্ঞাসাবাদ করার ক্ষেত্রেও তদন্তকারীদের বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল বলে রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে।
৯/১১ হামলায় নিহতদের পরিবারগুলির দায়ের করা একটি বিশাল অঙ্কের মামলার সূত্র ধরেই এই তথ্যগুলি নতুন করে সামনে এসেছে বলে জানা যাচ্ছে। ওই মামলায় সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হামলার সঙ্গে যোগ থাকার অভিযোগ তোলা হয়েছিল। সেই আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যেই পুরনো তদন্ত-সংক্রান্ত তথ্য ও নথি প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে।
অবসরপ্রাপ্ত এফবিআই এজেন্ট ড্যানিয়েলও এই তথ্য প্রকাশ্যে আসার সময় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, হামলার মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এই তথ্য তদন্তকারীদের হাতে পৌঁছনো উচিত ছিল। এত বছর পর সেগুলি সামনে আসায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, ৯/১১-র তদন্তের সময় গুরুত্বপূর্ণ কোনও তথ্য চাপা পড়েছিল কি না।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে ২০১৭ সালের একটি গোপন এফবিআই রিপোর্ট ঘিরে। বিবিসির দাবি, সেখানে আল বায়ুমি ৯/১১ হামলা সম্পর্কে আগে থেকেই জানতেন কি না, সেই সম্ভাবনাকে প্রায় ‘৫০/৫০’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল।
তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে এখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন—আল বায়ুমির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং তাঁর সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে নতুন তথ্য সামনে এলেও, এগুলি ৯/১১ হামলায় তাঁর অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার সমতুল নয়। একইভাবে সৌদি আরবও ৯/১১ হামলার সঙ্গে রাষ্ট্রীয়ভাবে যুক্ত থাকার অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে এসেছে।
ফলে ২৫ বছর পর নতুন ভিডিও, পুরনো এফবিআই নথি এবং আদালতের মামলার সূত্রে সামনে আসা তথ্য ৯/১১ হামলার তদন্ত নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। আল বায়ুমির ভূমিকা কী ছিল, তদন্তকারীদের হাতে থাকা তথ্য কেন দীর্ঘদিন গোপন ছিল এবং সৌদি সংযোগ নিয়ে তদন্ত কতটা এগিয়েছিল—এই প্রশ্নগুলির উত্তর এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।






