নেপাল ঘুরে পাকিস্তানে পৌঁছাত ভারতীয় সিম, চালানো হত হানিট্র্যাপ! ধৃত ৩ পাক চরকে জেরা করে বিস্ফোরক তথ্য পেল এসটিএফ

উত্তরবঙ্গ থেকে পাক গুপ্তচর সন্দেহে ধৃত ৩ অভিযুক্তকে জেরায় একের পর এক হাড়হিম করা তথ্য উঠে আসছে তদন্তকারীদের হাতে। কলকাতা পুলিশ এবং রাজ্য পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (STF)-এর যৌথ জেরায় পরিষ্কার হয়েছে যে, কেবল জালনোট বা গোরু পাচার নয়, সীমান্ত পার করে পাকিস্তানের গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের কাছে ভারতীয় সিম পৌঁছানোর এক আন্তর্জাতিক চক্র সক্রিয় ছিল।
কীভাবে কাজ করত আন্তর্জাতিক সিম পাচার নেটওয়ার্ক?
তদন্তে প্রকাশ, ভারতের জাল নথিপত্র ব্যবহার করে ভুয়া টেলিকম সিমকার্ড সংগ্রহ করা হত। সেই সিমকার্ডগুলি সীমান্ত পার করে প্রথমে বাংলাদেশ ও নেপালে পৌঁছাত। সেখান থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধী হ্যান্ডলারদের মাধ্যমে সেই সক্রিয় সিমগুলি পৌঁছে যেত সরাসরি পাকিস্তানে।
পাকিস্তানের মাটি থেকে এই ভারতীয় মোবাইল নম্বরগুলি ব্যবহার করে:
- হানিট্র্যাপ (Honeytrap): ভারতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ও আধিকারিকদের ব্ল্যাকমেইল বা ফাদে ফেলার কাজ চালানো হত।
- নাশকতার হুমকি: ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে বা ভীতি তৈরি করতে ওই নম্বরগুলি থেকে নানা হুমকি কল করা হত।
ধৃত ৩ অভিযুক্ত ও তাদের চাঞ্চল্যকর স্বীকারোক্তি
[ধৃতদের তালিকা ও ভূমিকা]
১. মহম্মদ শফিকুল ইসলাম (পাঞ্জিপাড়া, উত্তর দিনাজপুর): আকবর ওরফে সম্রাটের হাতে সিম হস্তান্তর ও জালনোট সংরক্ষণে যুক্ত।
২. নুর নাসিরুদ্দিন আলি (কোচবিহার): ২০১৮-তে বেআইনি বাংলাদেশে প্রবেশ, জোড়া সিম সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক পাচার যোগ।
৩. রাশিদুল ইসলাম (কোচবিহার): ২০২৩ থেকে নাজিরহাট ও নয়ারহাটে জালনোট পাচার এবং ২.৫ লক্ষ টাকা লেনদেন পরিচালনা।
শফিকুল ইসলাম:
গোরু পাচারের সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা স্বীকার করেছে শফিকুল। সে জানিয়েছে, ‘আকবর ওরফে সম্রাট’ নামে এক বাংলাদেশি যুবকের সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়। শফিকুল আকবরকে ভারতীয় সিম দেয়, যা পরবর্তীতে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। তার মোবাইলে জালনোটের একাধিক ছবি ও ভিডিও মিলেছে।
নুর নাসিরুদ্দিন আলি:
২০১৮ সালে বেআইনিভাবে বাংলাদেশে যাওয়া নাসিরুদ্দিন গোরু পাচারের মামলায় যুক্ত ছিল। আকবরের নির্দেশে সে নিজের পরিচয়পত্র দিয়ে তৈরি দুটি সিম বাংলাদেশে পাঠায়। ভারত-পাকিস্তান আন্তর্জাতিক সিম নেটওয়ার্কে তার প্রত্যক্ষ যোগ মিলেছে।
রাশিদুল ইসলাম:
২০২৩ সাল থেকে নাজিরহাট ও নয়ারহাট সীমান্তে প্রায় ২ বছর ধরে জালনোট পাচার চক্র চালাত সে। আকবর প্রদীপ্ত বসু নামে এক ব্যক্তির মাধ্যমে আড়াই লক্ষ টাকা পাঠায়, যা নাসিরুদ্দিনের কাছে পৌঁছে দেওয়ার গুরুদায়িত্ব ছিল রাশিদুলের ওপর।
নতুন নামের তালিকা ও তদন্তের পরবর্তী ধাপ
ধৃতদের মোবাইল ডেটা বিশ্লেষণ করে একাধিক নতুন সন্দেহভাজনের নাম উঠে এসেছে— দাদা, হায়দার, প্রদীপ্ত বসু, এবং বিশাল ওরফে কাঞ্চন।
এসটিএফ কর্তারা মনে করছেন, এই চক্রের শিকড় দেশের বাইরেও বিস্তৃত। ধৃতদের মুখোমুখি বসিয়ে জেরা করে এবং বাজেয়াপ্ত মোবাইলগুলির ফরেনসিক পরীক্ষা চালিয়ে এই চক্রের বাকি মাস্টারমাইন্ডদের সন্ধান পাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এক নজরে চক্রের কাজ:
| বিষয় | বিবরণ |
| তদন্তকারী সংস্থা | কলকাতা পুলিশ এসটিএফ ও রাজ্য পুলিশ এসটিএফ |
| মূল রুটিং | ভারত ➔ নেপাল / বাংলাদেশ ➔ পাকিস্তান |
| অপারেশনের উদ্দেশ্য | হানিট্র্যাপ, নাশকতার হুমকি ও আন্তর্জাতিক জালনোট কারবার |
| মূল সংযোগকারী | আকবর ওরফে সম্রাট (বাংলাদেশি যুবক) |
| আর্থিক লেনদেন | প্রদীপ্ত বসুর মাধ্যমে আড়াই লক্ষ টাকার আদান-প্রদান |
সীমান্তের ওপার থেকে পরিচালিত এই বিপজ্জনক সাইবার ও নিরাপত্তা ষড়যন্ত্র ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিল। তবে দুই এসটিএফের তৎপরতায় সিম ও জালনোট পাচারের এই আন্তর্জাতিক চক্র ফাঁস হওয়ায় নাশকতার এক বড় ছক বানচাল করা সম্ভব হলো।






