‘বন্দে মাতরম’-এর ১৫০ বছর: জামদানি শাড়িতে দেশপ্রেমের গল্প বুনলেন রাষ্ট্রপতি পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনব বসাক

জাতীয় সংগীত ও স্বাধীনতার আবেগের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে ‘বন্দে মাতরম’। সার্ধশতবর্ষের বিশেষ লগ্নে এই প্রথমবার দিল্লির লালকেল্লা থেকে কলকাতার রেড রোডের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে প্রতিধ্বনিত হলো এই ধ্বনি। ঠিক সেই আবহেই বাংলার প্রখ্যাত তাঁতশিল্পে রচিত হলো এক নতুন ইতিহাস। রাষ্ট্রপতি পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রখ্যাত তাঁত শিল্পী অভিনব বসাক বাংলার ঐতিহ্যবাহী জামদানি শাড়ির ভাঁজে বুনলেন দেশপ্রেমের কাহিনি।
১৫ দিনের পরিশ্রমে তৈরি ‘বন্দে মাতরম’ জামদানি
হালকা অফ-হোয়াইট রঙের সূক্ষ্ম জামদানি শাড়ি। সারা জমিনজুড়ে ছোট ছোট বুটি এবং আঁচলে গেরুয়া ও সবুজ সুতোর ছোঁয়ায় স্পষ্ট অক্ষরে বোনা ‘বন্দে মাতরম’। অভিনব বসাকের নিজস্ব পরিকল্পনা ও নকশায় তাঁতি শচীনের কারিগরি দক্ষতায় প্রায় ১৫ দিনের অক্লান্ত পরিশ্রমে এই অনন্য শিল্পকর্ম রূপ পেয়েছে।
তবে এটি কোনো সাধারণ বাণিজ্যিক শাড়ি নয়। শিল্পীর কথায়:
“এটি সাধারণ পরিধানের উদ্দেশ্যে তৈরি কোনো শাড়ি নয়। ‘বন্দে মাতরম’ শব্দটি অত্যন্ত পবিত্র। এটি পরলে পায়ে লাগার বা অমর্যাদা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই এটি কেবল প্রদর্শনী ও সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে তৈরি একটি শিল্পকর্ম।”
এর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের স্বাধীনতা দিবসের সাজের কথা মাথায় রেখে তিনি বাজারে এনেছেন তেরঙ্গা নকশার নানা বৈচিত্র্যময় শাড়ি, যা ইতিমধ্যেই ক্রেতাদের নজর কেড়েছে।
[শাড়ির বিবরণ এক নজরে]
* ধরন: জামদানি (Off-White Base)
* নকশা: আঁচলে গেরুয়া ও সবুজে বোনা ‘বন্দে মাতরম’
* তৈরির সময়: ১৫ দিন
* উদ্দেশ্য: শিল্প প্রদর্শনী ও সংরক্ষণ (Exhibition & Preservation)
বলিউডের গ্ল্যামার থেকে রাজনীতি: জয়জয়কার বাংলার তাঁতের
জামদানি, শান্তিপুরী, বেগমপুরী কিংবা ধনেখালির তাঁতের শাড়ির কদর বিশ্বজুড়ে। বাংলার তাঁতিদের রক্তজল করা শ্রমে বোনা এই শাড়ি জয় করেছে বিশ্বমঞ্চ:
- বলিউড তারকা: বিদ্যা বালন, শাবানা আজমি থেকে ক্যাটরিনা কাইফের মতো আন্তর্জাতিক স্তরের তারকারা বিভিন্ন মঞ্চে বাংলার তাঁত পরে নজর কেড়েছেন।
- রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব: সোনিয়া গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, নির্মলা সীতারামন, স্মৃতি ইরানি এবং মহুয়া মৈত্রের মতো হেভিওয়েট নেত্রীদের পছন্দের তালিকায় সর্বদা শীর্ষে রয়েছে বাংলার তাঁতের শাড়ি।
সংকটের মুখে ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প
বাংলার তাঁতের চাহিদা দেশ-বিদেশে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেলেও বাস্তব পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। দিন দিন নতুন প্রজন্মের মধ্যে তাঁত বুননের আগ্রহ কমে যাওয়া এবং উপযুক্ত মজুরির অভাবে তাঁতিদের সংখ্যা ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। ফলে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প আজ এক বড়সড় অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের মুখে দাঁড়িয়েছে।
অভিনব বসাকের মতো শিল্পীদের এই ধরনের উদ্যোগ শুধু শিল্প নয়, বরং সংকটময় সময়ে বাংলার তাঁতশিল্পকে নতুন আলো দেখানোর এক সার্থক প্রয়াস।
এক নজরে বন্দে মাতরম শাড়ির বৈশিষ্ট্য:
| বিভাগ | তথ্য / বিবরণ |
| মূল শিল্পী | অভিনব বসাক (রাষ্ট্রপতি পুরস্কারপ্রাপ্ত তাঁত শিল্পী) |
| সহযোগী কারিগর | প্রবীণ তাঁত শিল্পী শচীন |
| ফ্যাব্রিক ও ডিজাইন | অফ-হোয়াইট জামদানি, তেরঙ্গা সুতোয় বন্দে মাতরম |
| ব্যবহারের ধরন | সংরক্ষিত শিল্পকর্ম (Non-wearable, Preservation Specimen) |
| বাণিজ্যিক সংস্করণ | সাধারণের জন্য তেরঙ্গা তাঁতের শাড়ি |
বাংলার ঐতিহ্যবাহী জামদানির সাথে জাতীয় ভাবাবেগের এই মিলন তাঁতশিল্পে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল। ‘বন্দে মাতরম’-এর মতো পবিত্র ধ্বনিকে তাঁতের বুননে সংরক্ষণ করে শিল্পী অভিনব বসাক কেবল দেশপ্রেমেরই পরিচয় দেননি, বরং সংকটে থাকা বাংলার তাঁতশিল্পের শক্তি ও সম্ভাবনাকেও বিশ্বদরবারে নতুন করে তুলে ধরেছেন।






