রেসিডেন্সিয়াল থেকে কমার্শিয়াল, এক গেটেই চলত একাধিক হোটেল? নিউ মার্কেট অগ্নিকাণ্ডে উঠছে একাধিক প্রশ্ন

রেসিডেন্সিয়াল বিল্ডিং থেকে কয়েক বছরের মধ্যে কমার্শিয়াল ভবন। দু’টি বাড়ি জুড়ে ইংরেজি ‘এল’ অক্ষরের মতো নির্মাণ। তার পর তিনতলা ভবনের প্রায় প্রতিটি তলাতেই হোটেল। ঘরগুলিও ছোট ছোট বলে অভিযোগ। নিউ মার্কেট থানার মির্জা গালিব স্ট্রিটের এই ভবনেই মঙ্গলবার রাতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যু হয়েছে ৯ জনের। তাঁদের মধ্যে ৬ জন পুরুষ, ২ জন মহিলা এবং এক শিশু। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে না পড়লেও ঘন কালো ধোঁয়ায় মুহূর্তের মধ্যে ঢেকে যায় গোটা বাড়ি।
প্রায় দু’ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন দমকলকর্মীরা। কিন্তু ততক্ষণে প্রাণ হারিয়েছেন ৯ জন। প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে, ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়েই তাঁদের মৃত্যু হয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডের পর থেকেই ভবনটির নির্মাণ এবং সেখানে হোটেল ব্যবসা চালানোর অনুমোদন নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠছে। আবাসিক এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের একাংশের অভিযোগ, যে ভাবে ওই ভবনে হোটেলগুলি চলছিল, তাতে নিয়মকানুন মানা হয়নি। বিশেষ করে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং জরুরি বহির্গমন পথ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
একটি সরু গেটই কি ছিল একমাত্র ভরসা?
অভিযোগ, কমার্শিয়াল ভবনের ক্ষেত্রে জরুরি পরিস্থিতিতে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পৃথক এক্সিট গেট থাকা প্রয়োজন। কিন্তু মির্জা গালিব স্ট্রিটের ওই ভবনে এমন কোনও জরুরি বহির্গমন পথ ছিল না বলে দাবি স্থানীয়দের। প্রবেশ ও বেরনোর জন্য একটি মাত্র গেট ছিল এবং সেটিও যথেষ্ট সরু বলে অভিযোগ।
এক স্থানীয় ব্যবসায়ী জানান, প্রায় তিন-চার বছর আগে দু’টি আলাদা বাড়িকে জুড়ে দেওয়া হয়। তাঁর দাবি, পিছনের দিকে থাকা ভিন্ন ঠিকানার একটি বাড়িকে সামনের বাড়ির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু সেই কাজের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নিয়ম মানা হয়নি বলেই তাঁর অভিযোগ।
ওই ব্যবসায়ীর কথায়, “তিন-চার বছর আগে ২টি বাড়ি জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। পিছনের দিকে থাকা সম্পূর্ণ ভিন্ন ঠিকানার বাড়িকে জোড়া হয়েছিল সামনের একটি বাড়ির সঙ্গে। এ ক্ষেত্রে নিয়ম মানা হয়নি। বাইরে বেরনোর পথ ছিল না। থাকলেও তা খুবই সঙ্কীর্ণ।”
ধোঁয়ায় পথ হারিয়েছিলেন আবাসিকরা
আগুন লাগার পর হোটেলের আবাসিকরা দ্রুত বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেন। কিন্তু ততক্ষণে কালো ধোঁয়ায় গোটা ভবন ঢেকে যাওয়ায় কোন পথে বেরোতে হবে, তা বুঝতে সমস্যায় পড়েন অনেকে।
প্রাণ বাঁচাতে কয়েকজন আবাসিক শৌচাগারে আশ্রয় নেন। পরে দমকলকর্মীরা তাঁদের সেখান থেকে উদ্ধার করেন।
এক আবাসিকের দাবি, দমকলকর্মীরা সময়মতো ঘটনাস্থলে না পৌঁছলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারত। তাঁর কথায়, “দমকলের কর্মীরা সময় মতো না এলে আমরাও হয়তো বাঁচতে পারতাম না। আমাদের উদ্ধার করতে দমকলকেও বেগ পেতে হয়েছে।”
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়, যে ভবনে আগুন লেগেছিল, তার পাশেই রয়েছে দমকলের দপ্তর।

দমকলের পাশেই কীভাবে চলছিল হোটেল?
এই জায়গাতেই উঠছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। দমকল দপ্তরের এত কাছেই যদি একটি ভবনে একাধিক হোটেল চলত, তাহলে এতদিন বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এল না কেন? হোটেল পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় দমকলের ছাড়পত্র আদৌ ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
রাজ্যের দমকল প্রতিমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী জানিয়েছেন, হোটেলগুলির অনুমোদন এবং ট্রেড লাইসেন্সের বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে।
তিনি বলেন, “কী করে এই হোটেলগুলো পারমিট পেল, ট্রেড লাইসেন্স পেল, সেটা তদন্ত করে দেখা খুবই প্রয়োজন। আমরা সব খতিয়ে দেখে কড়া ব্যবস্থা নেব। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মুখ্যমন্ত্রী ঘটনার দিকে নজর রেখেছেন।”
‘আবাসিক ভবন বেআইনি ভাবে বাণিজ্যিক করা হয়েছে’, অভিযোগ
ভবনটির নির্মাণ নিয়ে আরও গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন বিজেপি নেতা সন্তোষ পাঠক। তাঁর দাবি, হোটেলগুলিতে ঘরের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য পিলার কেটে জায়গা বাড়ানো হয়েছিল। এর ফলে ভবনটির কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছিল বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
সন্তোষ পাঠকের দাবি, “এগুলো মূলত আবাসিক ভবন ছিল। সেটাকে বেআইনি ভাবে বাণিজ্যিক করা হয়েছে।”
তবে ভবনটির নির্মাণ, হোটেল পরিচালনার অনুমোদন, দমকলের ছাড়পত্র এবং অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলির সত্যতা তদন্তের পরই স্পষ্ট হবে। নিউ মার্কেটের এই অগ্নিকাণ্ডের পর এখন সেই তদন্তের দিকেই নজর রয়েছে।






