Nepal Flood China: হড়পা বান নিয়ে চিনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ, তিব্বতে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির দাবি

নেপালের ভয়াবহ হড়পা বানের পর প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণ এবং এর নেপথ্যে মানুষের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। নেপাল ও তিব্বতের পরিস্থিতি ঘিরে চিনের দিকে অভিযোগের আঙুল উঠেছে। তবে চিন বরাবরের মতোই এই ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
নেপালের পরিবেশবিদ ও সাংবাদিকদের একাংশের অভিযোগ, তিব্বত সীমান্তে চিনের বিভিন্ন নির্মাণকাজ, পাহাড় কেটে রাস্তা বা বসতি তৈরি এবং ত্রিশূলি নদীর গতিপথ পরিবর্তনের চেষ্টা হিমালয়ের পরিবেশগত ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও এসব কর্মকাণ্ডই সাম্প্রতিক হড়পা বানের সরাসরি কারণ—এমন কোনও চূড়ান্ত প্রমাণ এখনও সামনে আসেনি।
তিব্বতের ক্ষয়ক্ষতি নিয়েও উঠছে প্রশ্ন
চিন-অধিকৃত তিব্বতের নেপাল সীমান্তবর্তী এলাকাগুলির পরিস্থিতি নিয়েও নানা দাবি সামনে এসেছে। চিনা কর্তৃপক্ষের তরফে মাত্র ১৬ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন ফর টিবেট’-এর দাবি, প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা এর তুলনায় অনেক বেশি।
সংগঠনটির দাবি অনুযায়ী, তিব্বতে ৫০০-র বেশি মানুষ মারা গিয়ে থাকতে পারেন, নিখোঁজের সংখ্যা ১০০০-র বেশি এবং অন্তত ৩০০টি বাড়িঘর ধ্বংস হয়েছে। তবে এই পরিসংখ্যানের স্বাধীনভাবে নিশ্চিতকরণ সম্ভব হয়নি।
তিব্বতের পরিস্থিতি নিয়ে তথ্যের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ, নেপাল সীমান্ত সংলগ্ন গ্যিরং এলাকার বিপর্যয়ের কিছু ছবি ও ভিডিও চিনা সংবাদমাধ্যম এবং সমাজমাধ্যমের প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভুটানি সংবাদ সংস্থাকে উদ্ধৃত করে কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও এমন দাবি প্রকাশিত হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।

চিনা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ফের বিস্ফোরক অভিযোগ
এর মধ্যেই ত্রিশূলিতে কর্মরত নেপালি শ্রমিক রাজ ছেত্রীর অভিযোগে নতুন করে চিনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
রাজের দাবি, হড়পা বান আছড়ে পড়ার সময় তিনি ত্রিশূলির একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে কাজ করছিলেন। সেখানে কয়েকশো শ্রমিক কর্মরত ছিলেন। আচমকা জল ও কাদা সুড়ঙ্গে ঢুকতে শুরু করলে শ্রমিকরা চিনা সুপারভাইজ়ারের কাছে বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার অনুমতি চান।
রাজের অভিযোগ, সুপারভাইজ়ার তাঁদের বেরোতে না দিয়ে পরিস্থিতি দেখার কথা বলেন। এরপর তিনি নিজেই সেখান থেকে চলে যান বলে দাবি রাজের।

মাত্র চার জনের পালিয়ে বাঁচার দাবি
রাজ জানিয়েছেন, সুড়ঙ্গে কর্মরত শ্রমিকদের মধ্যে মাত্র চারজন কোনওভাবে পালিয়ে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। তাঁদের মধ্যে দু’জন এখনও নিখোঁজ বলে দাবি তাঁর।
সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে আসার পর মোবাইলে নেটওয়ার্ক না থাকায় কয়েক দিন জঙ্গলের মধ্যে গাছের তলায় কাটাতে হয়েছিল বলেও জানিয়েছেন রাজ। পরে নেটওয়ার্ক ফিরে এলে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি।
তাঁর আরও অভিযোগ, চিনা সুপারভাইজ়ারের আচরণ দেখে তাঁর মনে হয়েছিল, হয়তো চিনা কর্তৃপক্ষ আগেই বিপর্যয়ের খবর পেয়েছিল। কিন্তু শ্রমিকদের সেই বিষয়ে সতর্ক করা হয়নি বলেই এত প্রাণহানি হয়েছে বলে দাবি রাজের।
এই অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা হয়নি। চিনা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে কী বক্তব্য, সেটিও স্পষ্ট নয়।
পরিবেশগত বিপর্যয় নিয়ে বড় প্রশ্ন
নেপালে সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের পর শুধু চিনের ভূমিকা নয়, গোটা হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তন, হিমবাহ গলা, নদীর গতিপথে পরিবর্তন এবং পাহাড়ি এলাকায় নির্মাণকাজের প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
নেপালের পক্ষ থেকে ভারত, চিন ও আমেরিকার অতিরিক্ত গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণকেও জলবায়ু পরিবর্তনের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দায়ী করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে একটি নির্দিষ্ট হড়পা বানের সঙ্গে কোনও দেশের গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের সরাসরি যোগ প্রমাণ করতে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

নেপাল-তিব্বতের বিপর্যয় ঘিরে বাড়ছে রাজনৈতিক চাপ
একদিকে নেপালে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু ও নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা, অন্যদিকে তিব্বতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিয়ে পরস্পরবিরোধী দাবি—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমশ রাজনৈতিক রূপ নিচ্ছে।
নেপাল ও তিব্বতের বিভিন্ন মহল থেকে চিনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও বেজিং এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। ফলে হড়পা বানের প্রকৃত কারণ, আগাম সতর্কবার্তা আদৌ দেওয়া হয়েছিল কি না এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলিতে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল—এই প্রশ্নগুলির উত্তর পেতে নিরপেক্ষ তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে ঘিরে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের মধ্যেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে নিখোঁজ মানুষদের সন্ধান এবং দুর্গতদের উদ্ধার। কারণ, রাজনৈতিক চাপানউতোরের বাইরে এখনও হাজার হাজার পরিবার অপেক্ষা করছে প্রিয়জনের ফিরে আসার আশায়।






