২১০০-তে ৫.৪ ডিগ্রি উষ্ণ হতে পারে দার্জিলিং, বাড়ছে ভূমিধসের ঝুঁকি

নামেই হয়তো থেকে যাবে ‘শৈল শহর’! আগামী কয়েক দশকে দার্জিলিং পাহাড়ের মনোরম ঠান্ডা আবহাওয়া বড়সড় পরিবর্তনের মুখে পড়তে পারে। এমনকী ২১০০ সালের মধ্যে দার্জিলিংয়ের গড় তাপমাত্রা ৫.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছে রাষ্ট্রসংঘের জলবায়ু বিষয়ক বিজ্ঞান পর্যালোচনা সংস্থা ‘ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ’ বা আইপিসিসি। একইসঙ্গে অতিবৃষ্টির ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় শহর ও সংলগ্ন পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকিও আরও বাড়তে পারে।
আইপিসিসির ষষ্ঠ মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দার্জিলিং পাহাড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে সতর্ক করা হয়েছে। প্রতিবেদনে দেওয়া আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি শতাব্দীর শেষ নাগাদ দার্জিলিংয়ের গড় তাপমাত্রা ৫.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে। এর ফলে এক সময়ের হিমেল আবহাওয়ার জন্য পরিচিত এই পাহাড়ি শহরের জলবায়ু ও পরিবেশে বড় পরিবর্তন আসার আশঙ্কা রয়েছে।
তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব ইতিমধ্যেই দার্জিলিংয়ের বাস্তুতন্ত্রে দেখা দিতে শুরু করেছে বলে পরিবেশবিদ ও গবেষকদের একাংশের মত। পাহাড়ি উদ্ভিদের স্বাভাবিক ঋতুচক্রেও পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। স্থানীয়ভাবে ‘লালী গুরাঁস’ নামে পরিচিত রডোডেনড্রন অসময়ে ফুটতে শুরু করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে এই ধরনের অকাল ফেনোলজিক্যাল পরিবর্তনের যোগ রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
শুধু তাপমাত্রা বৃদ্ধি নয়, দার্জিলিংয়ের জন্য আরও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রবল বৃষ্টিপাত। অল্প সময়ে অত্যধিক বৃষ্টির ঘটনা বাড়তে থাকায় পাহাড়ি মাটির স্থিতিশীলতা নষ্ট হচ্ছে। ফলে দার্জিলিং শহর এবং আশপাশের এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকি ক্রমশ বাড়ছে।

ভূগোলের গবেষক ও পরিবেশকর্মীদের সতর্কতা, উন্নয়নের বর্তমান পদ্ধতিতে দ্রুত পরিবর্তন না আনা হলে ভবিষ্যতে দার্জিলিং বসবাসের পক্ষে আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। প্রশাসনিক তথ্য অনুযায়ী, শুধুমাত্র ২০২১ সালে ভারী বৃষ্টির জেরে দার্জিলিং শহর ও সংলগ্ন এলাকায় ২৭০টিরও বেশি ভূমিধস এবং জলমগ্নতার ঘটনা ঘটেছিল।
২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে দার্জিলিংয়ে ১৩৮টি দুর্যোগের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ১০০টি ঘটনাই ছিল ভূমিধসের। এর আগেও ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাক্ষী হয়েছে পাহাড়ি এই শহর। ২০১৫ সালে ধারাবাহিক ভূমিধসে ৩৮ জনের মৃত্যু হয়। বহু মানুষ আহত ও নিখোঁজ হন এবং বহু পরিবার ঘরবাড়ি হারায়।
দার্জিলিংয়ের ভূপ্রকৃতিও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ভূগোলের গবেষক তথা চোপড়া কলেজের অধ্যক্ষ মধুসূদন কর্মকারের মতে, দার্জিলিংয়ের শিলাস্তর অত্যন্ত ভঙ্গুর এবং এর ঘনত্বও তুলনামূলকভাবে কম। পাশাপাশি, এই অঞ্চলে দেশের অন্যতম বেশি বৃষ্টিপাত হলেও পাহাড়ের মাটির জল ধরে রাখার ক্ষমতা অত্যন্ত কম। ফলে ভারী বৃষ্টির সময় ভূমিধসের সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অপরিকল্পিত নির্মাণ। পাহাড়ে বাড়িঘর তৈরির ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়ম যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ বিশেষজ্ঞদের। ফলে প্রাকৃতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ঢালগুলিতে নির্মাণের চাপ আরও বাড়ছে।

দার্জিলিং পাহাড়ে ভূমিধসের ঝুঁকি নিয়ে অবশ্য বহু বছর আগেই সতর্ক করা হয়েছিল। ২০০০ সালে রাজ্য সরকারের নিযুক্ত একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি পাহাড়ের ভূপ্রকৃতি ও ভূমিধসের ঝুঁকি বিবেচনা করে আবাসন নির্মাণ সংক্রান্ত একাধিক নিয়মের প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু সেই সুপারিশগুলির অনেকগুলিই বাস্তবে কার্যকর হয়নি বলে অভিযোগ। বছরের পর বছর ধরে সেগুলি কার্যত ফাইলবন্দি হয়ে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের অন্যতম পরামর্শ ছিল, ৩০ ডিগ্রির বেশি ঢালু জমিতে নির্মাণকাজ না করা। কিন্তু বাস্তবে সেই নিয়মও যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকী বর্তমানে ৬৫ ডিগ্রি পর্যন্ত ঢালু জমিতেও বহুতল নির্মাণের নজির রয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং চরম বৃষ্টিপাতের প্রবণতা—এই দুইয়ের সঙ্গে যদি অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও পাহাড় কেটে নির্মাণ যুক্ত হয়, তাহলে দার্জিলিংয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ি শহরটির পরিবেশগত ভারসাম্য এবং মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখনই নির্মাণনীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় বড় পরিবর্তন প্রয়োজন।






