বন্দে মাতরম বিতর্কে কংগ্রেসের পাশে নেই শরিকরা? ফারুক-ওমরের অবস্থান ঘিরে চর্চা

‘বন্দে মাতরম’ বিতর্কে এবার প্রশ্ন উঠছে, কংগ্রেস কি ইন্ডিয়া জোটের মধ্যেই কিছুটা একঘরে হয়ে পড়ছে? জাতীয় গানের পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ গাওয়া নিয়ে কংগ্রেসের আপত্তির মধ্যেই জোটসঙ্গী ন্যাশনাল কনফারেন্সের দুই শীর্ষ নেতা ফারুক আবদুল্লা ও ওমর আবদুল্লাকে দেখা গেল সম্পূর্ণ ‘বন্দে মাতরম’ শুনে নীরবে দাঁড়িয়ে সম্মান জানাতে। যদিও তাঁদের কেউই গানের সঙ্গে গলা মেলাননি, তবে মাঝপথে গান বন্ধ করারও কোনও উদ্যোগ দেখা যায়নি।
সম্প্রতি শ্রীনগর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্বোধনী মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লা এবং তাঁর বাবা তথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ফারুক আবদুল্লা। সেখানেই ‘বন্দে মাতরম’ পরিবেশন করা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী প্রায় ৩ মিনিট ১০ সেকেন্ডের পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ বাজানো হয় বলে জানা গিয়েছে।
গান চলাকালীন বাবা ও ছেলে দু’জনেই দাঁড়িয়ে থেকে সম্মান প্রদর্শন করেন। তাঁরা অবশ্য গানের সঙ্গে গলা মেলাননি। অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় সরকারের একাধিক আধিকারিকের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিংও উপস্থিত ছিলেন।
এই ঘটনাই নতুন করে রাজনৈতিক তাৎপর্য তৈরি করেছে। কারণ, কংগ্রেসের অবস্থান হল ‘বন্দে মাতরম’-এর ছয়টি স্তবকের সম্পূর্ণ সংস্করণের পরিবর্তে ঐতিহাসিকভাবে কংগ্রেসের অধিবেশনগুলিতে ব্যবহৃত প্রথম দুই স্তবকই গাওয়া হবে। কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ গাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও কংগ্রেস সেই অবস্থান মানতে রাজি নয়।
কংগ্রেসের এই অবস্থানের বিপরীতে জোটসঙ্গী ন্যাশনাল কনফারেন্সের দুই শীর্ষ নেতার আচরণকে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ। বিশেষ করে জম্মু ও কাশ্মীরের মতো স্পর্শকাতর রাজনৈতিক অঞ্চলের দুই গুরুত্বপূর্ণ নেতার প্রকাশ্যে পূর্ণাঙ্গ গান চলাকালীন দাঁড়িয়ে সম্মান জানানোকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এদিকে স্বাধীনতা দিবসে কংগ্রেস সদর দপ্তরে ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ ঘিরেও বিতর্ক তুঙ্গে। এই ঘটনায় সোনিয়া গান্ধী ও রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে দিল্লি পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
ভাইরাল একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করেই এই অভিযোগ। ভিডিওতে দেখা যায়, কংগ্রেসের একটি অনুষ্ঠানে কয়েকজন তরুণী ‘বন্দে মাতরম’ পরিবেশন করছেন। সেই সময় সোনিয়া গান্ধীর কিছু অঙ্গভঙ্গি ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, ওই অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে তিনি কর্মীদের গান বন্ধ করার নির্দেশ দিচ্ছিলেন। যদিও ভিডিওর ওই দৃশ্যের ব্যাখ্যা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক রয়েছে।
ঘটনাটি সামনে আসার পর বিজেপি কংগ্রেসের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শুরু করেছে। বিজেপির অভিযোগ, কংগ্রেস জাতীয় সংগীত ও জাতীয় গানের মতো বিষয়েও রাজনৈতিক অবস্থান নিচ্ছে। অন্যদিকে কংগ্রেস তাদের অবস্থানকে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক যুক্তির ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করছে।
কংগ্রেসের বক্তব্য অনুযায়ী, স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় থেকেই দলের বিভিন্ন অধিবেশনে ‘বন্দে মাতরম’-এর নির্দিষ্ট দুইটি স্তবক গাওয়ার ঐতিহ্য রয়েছে। সেই ঐতিহ্যই বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে কেন্দ্রের নির্দেশে পুরো ছয়টি স্তবক গাওয়ার সিদ্ধান্ত তারা মানছে না।
কিন্তু ইন্ডিয়া জোটের শরিক ন্যাশনাল কনফারেন্সের দুই গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে যখন পূর্ণাঙ্গ ‘বন্দে মাতরম’ চলাকালীন নীরবে দাঁড়িয়ে সম্মান জানাতে দেখা গেল, তখন কংগ্রেসের অবস্থান নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, জোটের অভিন্ন অবস্থান থাকা সত্ত্বেও জাতীয় প্রতীক ও জাতীয় গানের মতো ইস্যুতে শরিক দলগুলির অবস্থানে যে পার্থক্য রয়েছে, এই ঘটনাটি তা স্পষ্ট করে দিয়েছে।
ফলে ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আগামী দিনে আরও তীব্র হতে পারে। কংগ্রেসের অবস্থান বনাম জোটসঙ্গীদের অবস্থান—এই দুইয়ের ফারাকই এখন জাতীয় রাজনীতিতে নতুন আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।






