
নেপালের ভয়াবহ হিমবাহ বিপর্যয়ের ক্ষত এখনও শুকোয়নি। তার মধ্যেই বিশ্বের হিমবাহগুলির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের নজরে এবার A23a—একসময় বিশ্বের সবচেয়ে বড় হিমবাহ হিসেবে পরিচিত এই বিশাল বরফখণ্ড দীর্ঘ সময় ধরে গলতে গলতে কার্যত অস্তিত্ব হারিয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
আয়তনে প্রায় ২,০০০ বর্গমাইল, অর্থাৎ বালি দ্বীপের কাছাকাছি বিশাল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত ছিল A23a। ১৯৮৬ সালে আন্টার্কটিকার Filchner Ice Shelf থেকে আলাদা হয়ে যায় এটি। ১৯৯১ সালে বিজ্ঞানীরা A23a-কে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় হিমবাহ হিসেবে চিহ্নিত করেন।
৪০ বছর ধরে বদলে যাচ্ছিল A23a
দীর্ঘদিন A23a-র গতিবিধিতে বড় কোনও পরিবর্তন চোখে পড়েনি। কিন্তু ২০২০ সালে অস্ট্রেলিয়ার আবহাওয়া বিভাগের নজরে আসে, বিশাল বরফখণ্ডটি নড়াচড়া শুরু করেছে।
এরপর ২০২৩ সালের শেষদিকে A23a উত্তরমুখী সরে যেতে শুরু করে। বরফের বিশাল অংশ সমুদ্রের উষ্ণ জলের সংস্পর্শে আসায় গলনের গতি আরও বাড়তে থাকে।
তবে এরপরই হিমবাহটির আচরণে অদ্ভুত পরিবর্তন দেখা যায়।

সমুদ্রের মধ্যে তৈরি হয়েছিল ‘বরফের পাহাড়’
উত্তাল সমুদ্রস্রোতের মধ্যে A23a-র একটি অংশ আটকে গিয়ে কার্যত সমুদ্রের মধ্যে বিশাল এক বরফের স্তম্ভের মতো দাঁড়িয়ে যায়। বিজ্ঞানীরা যার নাম দেন Taylor Column।
এই বরফের স্তম্ভ সমুদ্রস্রোতের স্বাভাবিক গতিপথেও প্রভাব ফেলেছিল। একইসঙ্গে উষ্ণ সমুদ্রস্রোতের সংস্পর্শে বরফ গলতে থাকে দ্রুত।
২০২৫ সালের মার্চে South Georgia-র কাছে A23a-র আরও একটি অংশ আটকে যায়। তৈরি হয় বিশাল বরফের প্রাচীর ও গুহার মতো কাঠামো। সেই সময়ও বিজ্ঞানীরা নিয়মিত এই হিমবাহের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করছিলেন।
সবচেয়ে বড় হিমবাহের তকমাও হারাল
ক্রমাগত ভাঙন ও গলনের ফলে A23a আর পৃথিবীর সবচেয়ে বড় হিমবাহ হিসেবে টিকে থাকতে পারেনি। একসময় যে বিশাল বরফখণ্ডকে দূর থেকে সমুদ্রের মধ্যে একটি পাহাড়ের মতো মনে হত, সেটিই ধীরে ধীরে ভেঙে ছোট ছোট অংশে পরিণত হয়েছে।
সমুদ্রের তলদেশে পর্যবেক্ষণের সময় বিজ্ঞানীরা পেঙ্গুইন, তিমি, মাছ ও বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণীর উপস্থিতিও দেখতে পান। সেই দৃশ্যকে অনেকটা আন্টার্কটিকার একটি ছোট অংশ সমুদ্রের মধ্যে উঠে আসার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছিল।
কিন্তু A23a-র দ্রুত পরিবর্তন জলবায়ু পরিবর্তন এবং মেরু অঞ্চলের উষ্ণায়ন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
এরপর কী?
A23a-র অস্তিত্ব প্রায় মুছে যাওয়ার ঘটনাকে বিজ্ঞানীরা শুধু একটি হিমবাহের পরিণতি হিসেবে দেখছেন না। বরফ গলে সমুদ্রের পরিবেশে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটতে পারে, সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রে তার কতটা প্রভাব পড়বে এবং ভবিষ্যতে আরও বড় বরফখণ্ড ভেঙে পড়ার ঝুঁকি কতটা—এই প্রশ্নগুলিই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
নেপালের হিমবাহ বিপর্যয় যেমন পাহাড়ি অঞ্চলের বিপদের ছবি সামনে এনেছে, তেমনই A23a-র পরিণতি চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে মেরু অঞ্চলের দ্রুত পরিবর্তনের চিত্র।
এক প্রান্তে হিমবাহ ভেঙে হড়পা বান, অন্য প্রান্তে বিশাল বরফখণ্ডের অস্তিত্ব হারিয়ে যাওয়া—প্রকৃতির এই বদলে যাওয়া আচরণ কি ভবিষ্যতের আরও বড় বিপর্যয়ের ইঙ্গিত?






