নেপালের বিপর্যয়ে মানবিকতার নজির, পকেটখরচ বাঁচিয়ে বন্যাদুর্গতদের পাশে ছোট পড়ুয়ারা

নেপালের ভয়াবহ বিপর্যয় ঘিরে এখনও কাটেনি শঙ্কা। উদ্ধারকাজ যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে ধ্বংসযজ্ঞের ভয়াবহ ছবি। একদিকে যেমন বিপর্যয়ের সুযোগে মৃতদেহ থেকে গয়না খুলে নেওয়ার মতো নিন্দনীয় ঘটনা সামনে আসছে, তেমনই এই কঠিন সময়ে নজর কাড়ছে মানবিকতার একাধিক নজির। দূরের এলাকার ছোট ছোট পড়ুয়ারা নিজেদের পকেটখরচ বাঁচিয়ে বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে মন ছুঁয়ে যাওয়ার মতো।

আচামের মঙ্গলসেন পুরসভার অন্তর্গত শোদশা সেকেন্ডারি স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র ইউনিক কেসির উদ্যোগেই শুরু হয় এমন এক মানবিক প্রচেষ্টা। সংবাদপত্র ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে নেপালের বিপর্যয়ের খবর নিয়মিত পড়তে পড়তে দুর্গত মানুষের জন্য কিছু করার ইচ্ছে জন্মায় তার মনে।
শোদশা সেকেন্ডারি স্কুলের পড়ুয়ারা মিলে আগে থেকেই ‘চাইল্ড ক্লাব’ নামে একটি সংগঠন তৈরি করেছিল। ওই ক্লাবের সদস্য এলাকার প্রায় দেড় হাজার পড়ুয়া। গত সোমবার ক্লাবের পক্ষ থেকে একটি বৈঠক ডাকা হয়। অবসরপ্রাপ্ত প্রধানশিক্ষকের ফেয়ারওয়েল অনুষ্ঠান নিয়ে আলোচনা চলছিল। সেই আলোচনার মাঝেই উঠে আসে নেপালের বন্যা ও বিপর্যস্ত মানুষের প্রসঙ্গ।
ইউনিক কেসি প্রস্তাব দেয়, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির শিশুদের জন্য কিছু করা হোক। কিন্তু কীভাবে সেই সাহায্যের জন্য অর্থ সংগ্রহ করা হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। শেষ পর্যন্ত পড়ুয়ারাই একটি সহজ সিদ্ধান্ত নেয়—নিজেদের পকেটখরচ থেকে টাকা বাঁচিয়ে সেই অর্থ সংগ্রহ করা হবে।
যেমন ভাবা, তেমনই কাজ। নিজেদের ছোট ছোট প্রয়োজন কিছুটা কমিয়ে পকেটখরচের টাকা জমাতে শুরু করেছে পড়ুয়ারা। সেই অর্থ দিয়ে বিপর্যস্ত পরিবারের শিশুদের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে তারা।
অর্থের পরিমাণ হয়তো খুব বড় নয়। বিপর্যয়ের ব্যাপকতার তুলনায় এই সাহায্য কতটা বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারবে, তা সময়ই বলবে। কিন্তু এই উদ্যোগের তাৎপর্য অন্য জায়গায়। হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে থাকা বিপর্যস্ত মানুষের কষ্টকে নিজেদের কষ্ট হিসেবে অনুভব করেছে এই কিশোর-কিশোরীরা। মানবিকতার সেই শিক্ষাই তাদের এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
নেপালের ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে তাই শোদশা সেকেন্ডারি স্কুলের পড়ুয়াদের এই উদ্যোগ নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে। ছোট বয়সেই মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যে শিক্ষা তারা নিজেদের মধ্যে তৈরি করছে, ভবিষ্যতের সমাজকে আরও মানবিক করে তোলার ক্ষেত্রে সেটিই হয়তো সবচেয়ে বড় সম্পদ।
এদিকে নেপালের বিপর্যয়ের ভয়াবহতা এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট হয়নি। ত্রিশূলী ও ভোটকোসি নদীর ধ্বংসযজ্ঞে এখনও পর্যন্ত প্রাণ গিয়েছে ১২৫৯ জনের। নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত ৫০০০ জন। জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে ৬৫৪১ জনকে।
ভয়াবহ বন্যা ও ধসের কারণে কত বাড়ি, অফিস, সেতু, দোকান ও বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনও প্রশাসনের হাতে নেই। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েক লক্ষ কোটি টাকা হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। এখনও পর্যন্ত প্রায় ১২ হাজার মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে বহু দুর্গম এলাকায় এখনও পৌঁছতে পারেননি উদ্ধারকারীরা।
ফলে আগামী দিনে হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেই দূরের দেশের ছোট পড়ুয়াদের এই মানবিক উদ্যোগ যেন মনে করিয়ে দিচ্ছে—বিপর্যয়ের সময়ে মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি হল মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছা।






