ইউটিউব দেখে সর্বমঙ্গলা মন্দিরে চুরির ছক! রেইকি করে গভীর রাতে তালা ভেঙে সাফারি, ধৃত ২ দুষ্কৃতীকে নিয়ে ঘটনার পুনর্নির্মাণ পুলিশের

সাধারণ মানুষ যেখানে ঈশ্বর দর্শনের জন্য বা মন্দির সংক্রান্ত তথ্যের জন্য ইউটিউবের সাহায্য নেন, সেখানে সোশ্যাল মিডিয়াকে চুরির ‘ব্লু-প্রিন্ট’ হিসেবে ব্যবহার করল পেশাদার অপরাধীরা! পূর্ব বর্ধমানের বিখ্যাত ও ঐতিহাসিক সর্বমঙ্গলা মন্দিরে চুরির ঘটনায় পুলিশি তদন্তে উঠে এল এমনই চমকপ্রদ তথ্য। ধৃতদের বয়ান ও গতিবিধি খতিয়ে দেখতে বুধবার তাদের মন্দিরে এনে পুরো ঘটনার পুনর্নির্মাণ করল পুলিশ।
ইউটিউবের ভিডিও দেখে প্ল্যানিং ও রেইকি
ঘটনার সূত্রপাত গত ১৪ জুলাই গভীর রাতে। সেদিন আচমকা সর্বমঙ্গলা মন্দিরের মূল গেটের তালা ভেঙে দুষ্কৃতীরা ভেতরে ঢোকে এবং চুরি করে চম্পট দেয়। ঘটনার তদন্তে নেমে বর্ধমান থানার পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রযুক্তিগত নজরদারির সাহায্য নিয়ে গত রবিবার উত্তর ২৪ পরগনা জেলায় অভিযান চালায়।
সেখান থেকেই পুলিশ পাকড়াও করে দুই অভিযুক্তকে—
- মনিরুল মণ্ডল: বাড়ি উত্তর ২৪ পরগনার আমডাঙা থানার শিকিরা গ্রামে (পেশায় মুটিয়া)।
- মহম্মদ আলমগীর সর্দার: বাড়ি অশোকনগর থানার সবদলপুর এলাকায় (পেশায় সেলাই কারিগর)।
পুলিশি জেরায় মুটিয়ার কাজ করা মনিরুল স্বীকার করে যে, সে ইউটিউবে পূর্ব বর্ধমানের সর্বমঙ্গলা মন্দিরের মহিমা ও ভিড়ের ভিডিও দেখেছিল। সেখান থেকেই তার মাথায় চুরির আইডিয়া খেলে যায়। এরপর একদিন বর্ধমানে এসে পুরো মন্দির এলাকা রেইকি (তদারকি) করে যায় সে।
[ঘটনার ক্রোনোলজি]
* চুরির রেইকি: ইউটিউবে ভিডিও দেখে সর্বমঙ্গলা মন্দিরে এসে রেইকি করা।
* চুরির দিন (১৪ জুলাই): গভীর রাতে শাবল দিয়ে গেটের তালা ভেঙে চুরি।
* গ্রেপ্তার (রবিবার): উত্তর ২৪ পরগনার আমডাঙা ও অশোকনগর থেকে ধৃত ২।
* রিকনস্ট্রাকশন (বুধবার): পুলিশি হেফাজতে নিয়ে মন্দির চত্বরে ঘটনার পুনর্নির্মাণ।
কান্না ও পারস্পরিক দোষারোপ: পুলিশি রিকনস্ট্রাকশন
বুধবার বর্ধমান থানার পুলিশ ধৃত দুই আসামিকে কড়া নিরাপত্তা বেষ্টনীতে সর্বমঙ্গলা মন্দির চত্বরে নিয়ে আসে। সাংবাদিকদের সামনেই তারা পুলিশকে হাতেনাতে দেখায় যে, কীভাবে শাবল দিয়ে গেটের শক্ত তালা ভেঙে চুরির কাজ হাসিল করেছিল।
ঘটনাস্থলে সেলাই কারিগর মহম্মদ আলমগীর সর্দার কেঁদে ফেলে নিজেকে নির্দোষ দাবি করার নাটক তৈরি করে। সে বলে—
“আমাকে ফাঁসিয়াছে মনিরুল। ও আমাকে ঘুরতে নিয়ে আসার নাম করে এখানে নিয়ে এসেছিল, আমি চুরির বিষয়ে কিছুই জানতাম না।”
তবে পুলিশ কর্তারা এই দাবিকে খাঁটি মিথ্যাচার ও অপরাধ হালকা করার নাটক বলেই মনে করছেন।
পরবর্তী টার্গেট ছিল তারকেশ্বর মন্দির!
জেরায় চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। ধৃতদের পরিকল্পনার ব্যাপ্তি ছিল বেশ বড়। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, যে রাতে উত্তর ২৪ পরগনা থেকে তাদের ধরে ফেলা হয়, সেই রাতেই হুগলি জেলার বিখ্যাত তারকেশ্বর মন্দিরে হানা দেওয়ার ছক কষেছিল তারা। তবে পুলিশের তৎপরতায় সেই বড় বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে। এই ঘটনার পেছনে কোনো বড় মন্দির-চোর গ্যাং বা স্থানীয় কোনো সহযোগীর হাত রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
এক নজরে সর্বমঙ্গলা মন্দির চুরির মামলা:
| বিষয় | বিবরণ |
| ঘটনাস্থল | সর্বমঙ্গলা মন্দির, পূর্ব বর্ধমান |
| ঘটনার তারিখ | ১৪ জুলাই (গভীর রাত) |
| ধৃতদের পরিচয় | ১. মনিরুল মণ্ডল (আমডাঙা) ২. মহম্মদ আলমগীর সর্দার (অশোকনগর) |
| চুরির কৌশল | ইউটিউবে রেইকি + শাবল দিয়ে তালা ভাঙা |
| পরবর্তী ছক | তারকেশ্বর মন্দিরে চুরি করার পরিকল্পনা ছিল |
ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার আলো ছড়ানোর পাশাপাশি অপরাধীরা কীভাবে প্রযুক্তিকে অপব্যবহার করছে, তা প্রমাণ করল এই ঘটনা। তবে বর্ধমান থানার পুলিশের সময়োপযোগী পদক্ষেপে চোরদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে এবং অন্যান্য মন্দিরে সম্ভাব্য চুরির পরিকল্পনাও বানচাল হয়ে গিয়েছে।






