ফেরিওয়ালার ছেলের অদম্য জেদ! দারিদ্রকে হারিয়ে আইআইটি খড়গপুরে গবেষণার সুযোগ বেলপাহাড়ির দেবকুমারের, খুশির হাওয়া ঝাড়গ্রামে

source : Sangbad Pratidin
ইচ্ছাশক্তি আর জেদের কাছে যে কোনো আর্থিক অনটনই হার মানতে বাধ্য— তা আরও একবার প্রমাণ করলেন ঝাড়গ্রামের জাড়দা গ্রামের তরুণ দেবকুমার সিংহ। ভাঙাচোরা সংসার, অ্যালুমিনিয়ামের বাসনপত্র ফেরি করা বাবার সামান্য আয়— কোনো কিছুই তাঁর স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। খড়গপুর আইআইটি-র মতো দেশের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গবেষণার সুযোগ পেয়ে নিজের পাশাপাশি পুরো গ্রাম ও জেলার নাম উজ্জ্বল করলেন এই যুবক।
প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে খড়গপুর আইআইটি
ঝাড়গ্রামের বেলপাহাড়ি ব্লকের প্রত্যন্ত জাড়দা গ্রামের ২৫ বছরের তরুণ দেবকুমারের শিক্ষার সূচনা স্থানীয় জাড়দা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে মাধ্যমিক ও ২০১৯ সালে মুড়ারী এসসি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন।
এরপর হলদিয়া গভর্নমেন্ট কলেজ থেকে ভূগোলে স্নাতক এবং কলকাতার আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন তিনি। সর্বভারতীয় স্তরে কঠিন UGC NET-JRF পরীক্ষায় দুর্দান্ত ফল করার পরেই উন্মুক্ত হয় আইআইটি খড়গপুরের দ্বার।
[দেবকুমার সিংহের শিক্ষাজীবনের এক নজরে]
* বিদ্যালয় পাঠ: জাড়দা প্রাথমিক ও মুড়ারী এসসি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় (উচ্চমাধ্যমিক: ২০১৯)।
* স্নাতক: হলদিয়া গভর্নমেন্ট কলেজ (বিষয়: ভূগোল)।
* স্নাতকোত্তর: আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা (বিষয়: ভূগোল)।
* বড় সাফল্য: ইউজিসি নেট-জেআরএফ (UGC NET-JRF) উত্তীর্ণ।
* বর্তমান প্রাপ্তি: খড়গপুর আইআইটি-র 'CRDIST' বিভাগে পিএইচডি/গবেষণা।
বাসনের ফেরিওয়ালা বাবার দুই রত্ন
দেবকুমারের বাবা লক্ষ্মীকান্ত সিংহ বহু বছর ধরে সাইকেলে করে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে ঘুরে অ্যালুমিনিয়ামের বাসনপত্র বিক্রি করেন। দিনের শেষে যা সামান্য আয় হতো, তা দিয়েই সংসার চালানোর পাশাপাশি তিন সন্তানের পড়াশোনার খরচ জুগিয়েছেন তিনি ও মা রিনা সিংহ।
তাঁদের এই ত্যাগ বৃথা যায়নি। বড় মেয়ের বিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি ছোট ছেলে প্রদ্যুৎ কুমার সিংহ গত বছর মেদিনীপুর মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস (MBBS) পাঠক্রমে ভর্তি হয়েছেন। আর এবার বড় ছেলে পাড়ি দিলেন আইআইটিতে।
“বাবা-মায়ের মুখের হাসিটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি”
গত ২৩ জুলাই বাবা লক্ষ্মীকান্ত বাবু ও মা রিনা দেবীকে সাথে নিয়েই খড়গপুর আইআইটিতে ভর্তি হতে যান দেবকুমার। নিজের এই রূপকথার মতো সাফল্যের পেছনে বিদ্যালয়ের শিক্ষক অচিন্ত্য সরকার স্যরের অবদানের কথা বিশেষভাবে স্মরণ করেন তিনি।
দেবকুমার জানান—
“একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণীতে অচিন্ত্য সরকার স্যরের ভূগোলের প্রতি ভালোবাসা থেকেই আমার উচ্চশিক্ষার আগ্রহ জন্মায়। ভর্তি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর আইআইটি ক্যাম্পাসে দাঁড়িয়ে বাবা-মায়ের মুখের সেই আনন্দাশ্রু আর হাসিটাই আমার জীবনের সেরা প্রাপ্তি। গ্রামীণ ভারতের উন্নয়নে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে কাজ করাই এখন আমার মূল লক্ষ্য।”
এক নজরে দেবকুমার সিংহের সাফল্য:
| বিষয়ের ক্ষেত্র | বিবরণ ও সাম্প্রতিক তথ্য |
| গবেষণার বিষয় | গ্রামীণ উন্নয়ন ও উদ্ভাবনী প্রযুক্তি (CRDIST)। |
| পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড | বাবা অ্যালুমিনিয়ামের বাসন ফেরিওয়ালা, ছোট ভাই এমবিবিএস ছাত্র। |
| অনুপ্রেরণা | একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণীর ভূগোলের শিক্ষক অচিন্ত্য সরকার। |
| ভর্তির তারিখ | ২৩ জুলাই ২০২৬ (মা-বাবাকে নিয়ে উপস্থিত হন)। |
বেলপাহাড়ির মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক সাধারণ ফেরিওয়ালার ছেলের এই অভাবনীয় সাফল্য রাজ্যের হাজার হাজার পিছিয়ে পড়া ছাত্রছাত্রীকে নতুন করে স্বপ্ন দেখার প্রেরণা জোগাবে। দেবকুমারের এই লড়াই প্রমাণ করে, সততা ও কঠোর পরিশ্রম থাকলে সুযোগের অভাব ঘটে না।






