‘কেউ বলে বিপ্লবী, কেউ বলে ডাকাত’ চলচ্চিত্র পর্যালোচনা: বিপ্লবী অনন্ত সিংহের চরিত্রে জিতের দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন!

হিন্দি সিনেমায় ‘চিটাগং’ বা ‘খেলে হাম জি জান সে’ ছবিতে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের পটভূমি উঠে এলেও বিপ্লবী অনন্ত সিংহকে নিয়ে পূর্ণাঙ্গ বাংলা বায়োপিক এতদিন তৈরি হয়নি (বলিউডে একসময় ইরফান খানকে নিয়ে এই পরিকল্পনার কথা ভাবা হলেও তা বাস্তবে রূপ নেয়নি)। অবশেষে স্বাধীনতা দিবসের এই আবহে সেই দীর্ঘদিনের অভাব দূর করলেন পরিচালক পথিকৃৎ বসু। অনন্ত সিংহের নিজের লেখা আত্মজীবনীর নাম অনুযায়ী তৈরি ‘কেউ বলে বিপ্লবী, কেউ বলে ডাকাত’ ছবির হাত ধরে প্রায় দুই বছর পর রুপোলি পর্দায় ফিরলেন সুপারস্টার জিৎ।
কাহিনির বিন্যাস ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত
পঞ্জাবি পরিবারে জন্ম নিলেও মনেপ্রাণে বাঙালি অনন্ত সিংহ ছিলেন বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্য সেনের অত্যন্ত কাছের সহযোগী। ব্রিটিশ আমলে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন ও ডিনামাইট ষড়যন্ত্রের প্রধান কারিগর অনন্ত সিংহ পরবর্তীতে আন্দামানের সেলুলার জেলে দীর্ঘ যন্ত্রণা ভোগ করেন। ১৯৩৮ সালে আলিপুর জেলে অনশনরত অবস্থায় তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন স্বয়ং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু।
স্বাধীনোত্তর ভারতে ব্যবসা ও চলচ্চিত্র প্রযোজনার আড়ালে প্রশাসনিক দুর্নীতি ও ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তিনি লড়াই চালিয়েছিলেন। সিনেমাটি হুবহু তাঁর জীবনপঞ্জি না হলেও, তাঁর জীবনের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ও স্বাধীন ভারতের দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধের কাহিনিকে দুর্দান্ত গতিতে পর্দায় তুলে ধরা হয়েছে।
[সিনেমার শক্ত ভিত]
* থিম: ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম ও স্বাধীন ভারতের দুর্নীতি প্রতিরোধ।
* হিরোইজিম: দক্ষিণী অ্যাকশন ধাঁচের সাথে জাতীয়তাবাদী ও সমাজ সংস্কারমুখী সংলাপে সমৃদ্ধ।
* টেকনিক্যাল মান: সৌমিক হালদারের ক্যামেরা এবং শান্তনু মৈত্রের আবহে পিরিয়ড ড্রামার আবহ তৈরি।
অভিনয়ের কাটাছেঁড়া: জিৎ-কেন্দ্রিক লার্জার-দান-লাইফ আখ্যান
একথা অনস্বীকার্য যে এই ছবি একেবারেই ‘জিতের ছবি’। যারা খাঁটি লার্জার-দান-লাইফ বাণিজ্যিক ছবি ও জিতের আভিজাত্য দেখতে প্রেক্ষাগৃহে যাবেন, তাঁদের কাছে এটি একটি খাঁটি ‘পয়সা উসুল’ অভিজ্ঞতা:
- জিতের পারফরম্যান্স: নানা বয়সের শেড, হরেক রকমের মেকআপ, বুক কাঁপানো সংলাপ এবং দক্ষিণী ধাঁচের চমৎকার অ্যাকশনে জিৎ পুরো সিনেমাটিকে নিজের কাঁধে টেনেছেন।
- সহ-অভিনেতারা: টোটা রায়চৌধুরী, চন্দন সেন এবং দুর্বার শর্মা দারুণ প্রভাব ফেলেছেন। অন্যদিকে কৌশিক সেন, লোকনাথ দে, দেবপ্রিয় মুখোপাধ্যায়ের মতো দাপুটে অভিনেতারা তাঁদের চরিত্র অনুযায়ী নিখুঁত।
- কিছু খামতি: বাস্তবের রুনু গুহ নিয়োগীর আদলে তৈরি রথিজিৎ নিয়োগীর চরিত্রে অভিনয় করা সুপ্রভাত দাস একজন অসাধারণ অভিনেতা হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে সংলাপে ও দৃশ্যে পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া হয়নি। এছাড়া মাস্টারদার চরিত্রে অতিরিক্ত বা বিসদৃশ মেকআপ কিছুটা চোখে লেগেছে, যা এড়িয়ে অভিনেতা হিসেবেই তাঁকে উপস্থাপন করা যেত।
কারিগরি দিক ও সঙ্গীত
ছবির সবচেয়ে শক্তিশালী স্তম্ভ হলো শান্তনু মৈত্রের সুর করা গান এবং সৌমিক হালদারের ক্যামেরা ওয়ার্ক। বারিশের কথায় অদৃজ ঘোষের গাওয়া ‘ভোর’ গানটি দীর্ঘক্ষণ মনে রাখার মতো। আবহাওয়া বজায় রাখতে আবহ সঙ্গীত বেশ সাহায্য করেছে। তবে ছবির শেষভাগে আদালতের দৃশ্যগুলি আরও একটু আঁটসাঁট ও সুপরিকল্পিত হতে পারত এবং প্রথমার্ধের কিছু কালানুক্রমিক অসঙ্গতি (Period inaccuracies) এড়ানো গেলে অভিজ্ঞতা আরও ভালো হতো। সম্পাদনার মাধ্যমে দৈর্ঘ্য কিছুটা কমালে চিত্রনাট্যের গতি আরও শার্প হতে পারত।
এক নজরে চলচ্চিত্র মূল্যায়ন:
| বিভাগ | মূল্যায়ন / হাইলাইটস |
| পরিচালনা | পথিকৃৎ বসু (ঐতিহাসিক পটভূমিকে কমার্শিয়াল ফর্মে দারুণ রূপান্তর) |
| মুখ্য অভিনয় | জিৎ (অনন্ত সিংহের চরিত্রে দুর্দান্ত মেকআপ ও অ্যাকশন) |
| আবহ ও সঙ্গীত | শান্তনু মৈত্র (অদৃজ ঘোষের ‘ভোর’ গানটি চমৎকার) |
| চিত্রগ্রহণ | সৌমিক হালদার (পিরিয়ড লুক ফুটিয়ে তুলতে প্রশংসনীয়) |
| প্লাস পয়েন্ট | প্রাসঙ্গিক বার্তা, জিতের অভিনয় ও হাই-ভোল্টেজ ডায়লগ |
| মাইনাস পয়েন্ট | মাস্টারদার মেকআপের খামতি ও আদালতের কিছুটা দুর্বল চিত্রনাট্য |
সব বিতর্ক বা কারিগরি খুঁটিনাটি পাশে সরিয়ে রাখলে, স্বাধীনতা দিবসের আবহে দেশের এক বিস্মৃত বিপ্লবীর অবদানকে মূলধারার পর্দায় এনে সম্মানিত করার প্রয়াসকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। আর সেই সাথে জিতের শক্তিশালী উপস্থিতি ও পর্দা কাঁপানো পারফরম্যান্স দর্শক ও ভক্তদের মন জয় করে নেবে বলেই আশা করা যায়।






