Nabadwip Lal Durga: ৩৫০ বছরের ইতিহাস, কেন রক্তবর্ণা দেবী ভট্টাচার্য বাড়িতে?

নবদ্বীপের যোগনাথতলার ভট্টাচার্য বাড়ির দুর্গাপুজো বাংলার প্রাচীন পুজোর ইতিহাসে একেবারেই ব্যতিক্রমী। কারণ এখানে দেবী দুর্গার গাত্রবর্ণ অতসী ফুলের মতো হলুদ নয়, বরং রক্তজবার মতো লাল। সেই বিশেষ রূপের জন্যই তিনি পরিচিত ‘লাল দুর্গা’ নামে।
ভাগবত তত্ত্ব ও শাক্ত সাধনার মেলবন্ধনের এই পীঠভূমিতে প্রায় সাড়ে তিনশো বছর ধরে চলে আসছে এই পুজো। তবে দেবীর বর্তমান রূপ ও পুজোর বিশেষ নিয়মের পিছনে জড়িয়ে রয়েছে এক মর্মান্তিক ও অলৌকিক কাহিনি।
১৬৭০ সালে শুরু পুজোর
কথিত আছে, ১৬৭০ খ্রিষ্টাব্দে রাঘব ভট্টাচার্যের হাত ধরে ভট্টাচার্য বাড়িতে দুর্গাপুজোর সূচনা হয়। তাঁদের আদি বাসস্থান ছিল পূর্ববঙ্গের ঢাকা জেলার মিতরায় গ্রামে। পরবর্তীকালে বিবাহসূত্রে রাঘব এ বাংলায় আসেন।
পরিবারের কাহিনি অনুযায়ী, গুরু তথা শ্বশুরের কাছ থেকে যৌতুক হিসেবে তিনি চেয়েছিলেন তাঁর আরাধ্য ধাতব মাতৃমূর্তি। রাজা দর্পনারায়ণ রায়ের সহায়তায় নবদ্বীপে নতুন ভিটে গড়ে ওঠে। সেখানেই পূর্ববঙ্গের মতো শুরু হয় দুর্গোৎসব।
১৬৮৫ সালের সেই মহানবমী
শাস্ত্রীয় ধ্যানমন্ত্রে দেবী দুর্গাকে বলা হয় ‘অতসীপুষ্পসংকাশা’, অর্থাৎ তাঁর গাত্রবর্ণ অতসী ফুলের মতো হলুদ।
কিন্তু ভট্টাচার্য বাড়ির বিশ্বাস অনুযায়ী, ১৬৮৫ সালের এক মহানবমীতে বদলে যায় সেই নিয়ম।
সেদিন নবমী তিথি ছিল স্বল্প। তিথি শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় রাঘবরাম দ্রুত চণ্ডীপাঠ করছিলেন। তাঁর ছোট ছেলে রামভদ্র বাবার পাঠে ভুল দেখতে পেয়ে বিষয়টি মাকে জানান। পরে রাঘবরামের কানে তা পৌঁছলে তিনি ক্ষুব্ধ হন এবং ছেলেকেই চণ্ডীপাঠে বসিয়ে দেন।

আচমকাই বদলে গেল দেবীর দিক ও রং
পরিবারের প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, রাঘবরাম উত্তরমুখী হয়ে বসেছিলেন এবং দেবী ছিলেন দক্ষিণমুখী। অন্যদিকে রামভদ্র পূর্বমুখী হয়ে চণ্ডীপাঠ শুরু করেন।
কিশোর রামভদ্র ভক্তিভরে পাঠ শুরু করতেই নাকি প্রতিমার কাঠামোয় মড়মড় শব্দ হতে থাকে। এরপর মৃন্ময়ী দেবী কারও সাহায্য ছাড়াই ঘুরে পশ্চিমমুখী হয়ে রামভদ্রের দিকে তাকান বলে বিশ্বাস করা হয়।
শুধু তাই নয়, দেবীর হলুদ অতসী বর্ণ মুহূর্তের মধ্যে রক্তবর্ণে পরিণত হয়। একইসঙ্গে গণেশ ও কার্তিকও নিজেদের স্থান পরিবর্তন করেন বলে পারিবারিক লোককথায় রয়েছে।
এই ঘটনার পর থেকেই ভট্টাচার্য বাড়ির দেবী হয়ে ওঠেন ‘লাল দুর্গা’।

রামভদ্রকে ঘিরে মর্মান্তিক কাহিনি
লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, চণ্ডীপাঠের তীব্রতা ও মাতৃ-আবাহনের প্রভাবে কিশোর রামভদ্রের প্রাণ যেন দেবীর মধ্যে লীন হতে থাকে। তাঁর শরীর ক্রমশ রক্তশূন্য হয়ে যায় বলে প্রচলিত কাহিনি।
বিজয়া দশমীর দিন মায়ের নিরঞ্জনের সঙ্গে সঙ্গেই ঘটে পরিবারের সেই ছেলের চিরবিদায়। ভক্তদের কাছে এটি এক অলৌকিক আত্মনিবেদনের কাহিনি হিসেবে আজও স্মরণীয়।
এই মর্মান্তিক ঘটনার পর রাঘবরাম সংকল্প করেন, এই বাড়িতে আর কখনও দেবীর সামনে চণ্ডীপাঠ হবে না।

৩৫০ বছর পরেও বদলায়নি নিয়ম
তারপর কেটে গিয়েছে প্রায় সাড়ে তিনশো বছর। সময় বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু ভট্টাচার্য বাড়ির দুর্গাপুজোর সেই বিশেষ নিয়ম আজও অটুট।
এখনও যোগনাথতলার ভট্টাচার্য বাড়িতে দেবী পশ্চিমমুখী ও রক্তবর্ণা। গণেশ ও কার্তিকও রয়েছেন সেই পরিবর্তিত অবস্থানেই।
আর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য—চণ্ডীপাঠ ছাড়াই পূজিত হন এই দেবী।
নবদ্বীপের অসংখ্য প্রাচীন দুর্গাপুজোর মধ্যে তাই ভট্টাচার্য বাড়ির ‘লাল দুর্গা’ একেবারেই আলাদা। ইতিহাস, পারিবারিক স্মৃতি, শাক্ত ঐতিহ্য এবং লোকবিশ্বাস মিলিয়ে এই পুজো আজও বহন করে চলেছে বাংলার এক অনন্য সনাতন উত্তরাধিকার।






