NEET PG 2026: নেপালে নিখোঁজ বাবা-মায়ের জন্য কেঁদে কেঁদে পরীক্ষা দিলেন তন্বী

বেঞ্চে বসে হাউহাউ করে কাঁদছিলেন তন্বী অন্নমদেভারা। সামনে NEET-PG পরীক্ষা, কিন্তু মন পড়ে ছিল নেপালের পাহাড়ে। নিখোঁজ বাবা-মায়ের কথা বারবার মনে পড়ছিল। সেই অবস্থাতেই গত ৩০ অগস্ট পরীক্ষার হলে বসেছিলেন তিনি। চোখের জল থামেনি, তবুও পরীক্ষা দিয়েছেন। কারণ, বাবার স্বপ্ন ছিল—মেয়ে ডাক্তার হবেন।
পরীক্ষার পর নিজের ইনস্টাগ্রাম পোস্টে সেই কঠিন মুহূর্তের কথা তুলে ধরেছেন তন্বী। জানিয়েছেন, বাবার স্বপ্ন পূরণ করতেই সমস্ত কষ্টকে পাশে সরিয়ে পরীক্ষা দিতে বসেছিলেন তিনি।
নেপালের হড়পা বানে নিখোঁজ বাবা-মা
২৬ অগস্ট ভয়াবহ হড়পা বানে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে নেপাল। প্রবল জলস্রোতে ভেসে যায় বহু বাড়িঘর, ধ্বংস হয় একের পর এক এলাকা। এই বিপর্যয়ে এক হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। এখনও নিখোঁজ বহু মানুষ।
তন্বীর বাবা ভেঙ্কটরাম অন্নমদেভারা এবং মা অনাঘাও সেই বিপর্যয়ের পর থেকে নিখোঁজ। রিচা ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলসের সঙ্গে ২৩ অগস্ট কৈলাস-মানসরোবর যাত্রায় গিয়েছিলেন তাঁরা।
শেষবার যখন পরিবারের সঙ্গে কথা হয়েছিল, তখন তাঁরা ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজ এলাকায় ছিলেন। পরবর্তী হড়পা বানে সেই ব্রিজ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। এরপর থেকেই বাবা-মায়ের সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
‘হলে বসে এত কেঁদেছি, প্রশ্নও পড়তে পারছিলাম না’
গত রবিবার ইনস্টাগ্রামে একটি ভিডিয়ো পোস্ট করেন তন্বী। সেখানে তিনি জানান, পরীক্ষার হলে বসে এতটাই কেঁদেছিলেন যে প্রশ্নপত্রের দিকে তাকাতেও পারছিলেন না।
তাঁর কথায়, শুধু বাবার জন্যই পরীক্ষা দিয়েছেন তিনি।
পরীক্ষার সময় কম্পিউটারের স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছিল তাঁর অ্যাডমিট কার্ড। সেই অ্যাডমিট কার্ডের ছবিটি তুলেছিলেন তাঁর বাবা। সেই কথা মনে পড়তেই ফের আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন তন্বী।
তিনি জানান, পরীক্ষার দেড় ঘণ্টা কার্যত কান্নার মধ্যেই কেটে যায়। কী ফল হবে, আদৌ কতটা পরীক্ষা দিতে পেরেছেন—সেসব নিয়েও অনিশ্চিত তিনি।
‘বাবার স্বপ্ন ছিল আমি ডাক্তার হই’
ছোটবেলা থেকেই পরীক্ষার আগে তন্বীর মা তাঁকে দই-চিনি খাইয়ে দিতেন। তারপর মেয়েকে পরীক্ষা দিতে পাঠাতেন।
এবার সেই রীতি ভেঙে গিয়েছে। মা নিখোঁজ। বাবাও নিখোঁজ। চোখে জল নিয়ে তন্বী বলেন, ‘তাই কিছুই হয়নি।’
তাঁর বাবা চাইতেন মেয়ে ডাক্তার হোক। ভালোভাবে NEET-PG পরীক্ষা দিক। সেই স্বপ্নের কথা মনে রেখেই সমস্ত মানসিক যন্ত্রণা সত্ত্বেও পরীক্ষার হলে বসেছিলেন তন্বী।
তাঁর কথায়, বাবার স্বপ্ন পূরণ করতেই তিনি পরীক্ষা দিয়েছেন। কিন্তু পরীক্ষা দিতে গিয়ে দীর্ঘ সময় কেঁদেছেন। ফল কী হবে, তা নিয়ে এখন আর ভাবছেন না তিনি।
এখনও আশায় তন্বী
সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতেও বাবা-মাকে নিয়ে আশা ছাড়তে নারাজ তন্বী। এখনও তাঁর বিশ্বাস, হয়তো কোনওভাবে তাঁরা বেঁচে গিয়েছেন।
আবেগপ্রবণ কণ্ঠে তন্বী বলেন, ‘বাবা-মাকে ফিরতেই হবে।’ ভগবানের কাছে এখন তাঁর একটাই প্রার্থনা—যেন বাবা-মা ফিরে আসেন।
‘হয়তো কোনও নিরাপদ জায়গায় রয়েছেন’
বাস্তবতা যতই কঠিন হোক, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আশাটুকু আঁকড়ে রয়েছেন তন্বী।
তাঁর ধারণা, হয়তো হড়পা বানের সময় বাবা-মা কোনওভাবে দৌড়ে নিরাপদ জায়গায় পৌঁছে গিয়েছিলেন। হয়তো কোনও স্থানীয় মানুষের আশ্রয়ে রয়েছেন। হয়তো কোনও জায়গায় উদ্ধার হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।
এই সম্ভাবনার কথা বলতে বলতেই ফের কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
একদিকে নেপালে নিখোঁজ বাবা-মায়ের অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা—দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়েও বাবার স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে NEET-PG পরীক্ষায় বসেছেন তন্বী। তাঁর এই লড়াই শুধু একটি পরীক্ষার নয়, বরং প্রিয়জনের ফিরে আসার আশায় এক মেয়ের অসম্ভব কঠিন অপেক্ষার গল্প।






