‘ইতিহাস আমার প্রতি সদয় হবে’, দূরদর্শী ভবিষ্যদ্বাণীই সত্যি! কয়লা কেলেঙ্কারি মামলায় প্রয়াত মনমোহন সিংকে ক্লিনচিট দিল সুপ্রিম কোর্ট

“History will be kinder to me than the contemporary media, or the Opposition in Parliament.” ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রিত্বের মেয়াদ শেষের শেষ সাংবাদিক সম্মেলনে গভীর আত্মবিশ্বাসের সাথে এই কথাটি উচ্চারণ করেছিলেন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ তথা ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ডঃ মনমোহন সিং। সময়ের চাকা ঘোরার সাথে সাথে টু-জি (2G) কেলেঙ্কারি, কমনওয়েলথ গেমস বিতর্কের মতো একের পর এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ ফিকে পড়েছে। এবার জীবনের শেষলগ্নে থাকা কয়লা কেলেঙ্কারির একচ্ছত্র দাগ থেকেও সুপ্রিম কোর্টের রায়ে সম্পূর্ণ মুক্ত হলেন ডঃ সিং।
২০১২ সালের তালাবিরা কয়লা ব্লক বণ্টন বিতর্ক
ঘটনার সূত্রপাত ২০১২ সালে ইউপিএ (UPA-2) জমানার শেষভাগে। ওড়িশার তালাবিরা-২ কয়লা ব্লক বেসরকারি সংস্থাকে বেআইনি ও নিয়মবহির্ভূতভাবে বন্টন করার মারাত্মক অভিযোগ ওঠে। সেই সময় কয়লা মন্ত্রকের দায়িত্ব সাময়িকভাবে ছিল স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের (PMO) অধীনে।
বিরোধীদের লাগাতার হইচই ও রাজনৈতিক চাপের মুখে তলব করা হয় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডঃ মনমোহন সিং, কয়লামন্ত্রী এবং একাধিক বর্ষীয়ান আমলাকে। নিম্ন আদালত ডঃ সিংকে অভিযুক্ত হিসেবে সমন পাঠালে দেশের প্রথম সারির সৎ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত মনমোহন সিংয়ের ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল তৎকালীন বিরোধী দলগুলি।
[তালাবিরা কয়লা ব্লক মামলার পর্যায়ক্রমিক ইতিহাস]
* ২০১২ সাল: ওড়িশার তালাবিরা কয়লা ব্লক বণ্টনে বেনিয়মের অভিযোগ।
* তদন্তভার: সিবিআই (CBI) যৌথভাবে তদন্ত শুরু করে।
* নিম্ন আদালতের পদক্ষেপ: প্রধানমন্ত্রী ডঃ মনমোহন সিংকে সমন জারি করা হয়।
* সিবিআইয়ের সিদ্ধান্ত: ডঃ সিংয়ের বিরুদ্ধে কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ না পাওয়ায় পেশ করা হয় ক্লোজার রিপোর্ট।
* ২০২৪ সাল: ডঃ মনমোহন সিংয়ের প্রয়াণ।
* ২০২৬ সাল (চূড়ান্ত রায়): সুপ্রিম কোর্ট সিবিআইয়ের ক্লোজার রিপোর্ট গ্রহণ করে মামলাটি চিরতরে নিষ্পত্তি করে।
সিবিআইয়ের ক্লোজার রিপোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ
সিবিআই দীর্ঘ তদন্ত চালানোর পর কোনো তথ্যপ্রমাণ না পেয়ে আদালতকে জানায় যে, ডঃ মনমোহন সিংকে এই ঘটনায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অভিযুক্ত হিসেবে দাঁড় করানোর মতো কোনো উপাদান নেই। ফলে তাঁর নামটি মামলা থেকে বাদ দিয়ে আদালতে ফাইনাল ‘ক্লোজার রিপোর্ট’ জমা দেয় সিবিআই।
বুধবার সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ সেই ক্লোজার রিপোর্ট গ্রহণ করে রায় দেয়। পর্যবেক্ষণ চলাকালীন বেঞ্চ স্পষ্ট জানায়—
“সিবিআইয়ের পেশ করা ক্লোজার রিপোর্ট খারিজ করার মতো কোনো পোক্ত ভিত্তি বা প্রমাণ আমাদের সামনে নেই। ফলে নিম্ন আদালত বা সিবিআইয়ের এই সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপের প্রশ্নই ওঠে না। তাছাড়া ডঃ মনমোহন সিং ২০২৪ সালেই প্রয়াত হয়েছেন। স্বভাবতই মামলাটি বর্তমানে নিষ্ফলা। এই মামলার ইতি এখানেই হওয়া উচিত ছিল।”
দাগমুক্ত এক সৎ রাজনীতিকের রাজনৈতিক ইতিহাস
দীর্ঘ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন থাকার পরও মনমোহন সিংয়ের ব্যক্তিগত সততা নিয়ে কখনো প্রশ্ন ওঠেনি। তাঁর আমলে একের পর এক আর্থিক দুর্নীতি নিয়ে বিরোধীরা তাঁকে “মৌন মোহন” বলে কটাক্ষ করলেও তিনি সর্বদা আইনি ব্যবস্থার ওপর বিশ্বাস রেখেছিলেন।
মৃত্যুর দু’বছর পর সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ে ইতিহাস তাকে কেবল একজন বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিবিদ হিসেবেই নয়, বরং রাজনৈতিক জটিলতার মাঝেও সম্পূর্ণ নিষ্পাপ ও দাগহীন এক মহান নেতা হিসেবে পুনপ্রতিষ্ঠিত করল।
এক নজরে কয়লা ব্লক মামলায় সুপ্রিম রায়:
| বিবরণ ক্ষেত্র | সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত ও পর্যবেক্ষণ |
| তদন্তকারী সংস্থা | কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা (CBI) |
| মূল অভিযোগ | ওড়িশার তালাবিরা কয়লা ব্লক বণ্টনে অনিয়ম |
| সিবিআইয়ের ভূমিকা | মনমোহন সিংয়ের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ না পেয়ে ক্লোজার রিপোর্ট পেশ |
| সুপ্রিম বেঞ্চ | প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের নেতৃত্বাধীন ডিভিশন বেঞ্চ |
| চূড়ান্ত রায় | ক্লোজার রিপোর্ট মঞ্জুর ও মনমোহন সিংকে সম্পূর্ণ দায়মুক্ত ঘোষণা |
রাজনীতি ও সংবাদমাধ্যমের ঝোড়ো বিতর্কের ধুলোবালি সরিয়ে সময় আজ ডঃ মনমোহন সিংয়ের প্রতি সত্যিই সদয়। সুপ্রিম কোর্টের এই রায় প্রমাণ করল, ক্ষণিকের রাজনৈতিক ফায়দা বা কুৎসা শেষ পর্যন্ত সত্য ও সততার কাছে পরাজিত হয়।






