১৭৭৬ সালে চন্দননগর থেকে সুদূর ফ্রান্সে পাড়ি! কৃত্তিবাসী রামায়ণের ‘আসল’ পুঁথি দেশে ফেরানোর আর্জি রাম-ভক্তকুলের

বাঙালির আবেগে ও ঘরে ঘরে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে কৃত্তিবাসী রামায়ণ আবর্তিত হয়ে চলেছে, তার ইতিহাসের সবচেয়ে অমূল্য উপাদান আজ হাজার হাজার মাইল দূরে ইউরোপের মাটিতে। কৃত্তিবাস ওঝার জন্মভিটে নদীয়া জেলার ফুলিয়া কিংবা কলকাতার ন্যাশনাল লাইব্রেরি— কোথাও নেই সেই তুলট কাগজে লেখা ‘আসল’ পাণ্ডুলিপি। কৃত্তিবাসের নিজের হাতে বা তাঁর সময়ের কাছাকাছি রচিত মূল পুঁথিটি আজ শোভা পাচ্ছে ফ্রান্সের প্যারিসে অবস্থিত জাতীয় গ্রন্থাগারে।
১৭৭৬ সালের ইতিহাস: যেভাবে চন্দননগর হয়ে ফ্রান্সে পাড়ি দিল রামায়ণ
স্বাধীনতার পূর্বে তৎকালীন চন্দননগর ছিল ফরাসিদের দখলে। ইতিহাস অনুযায়ী, সেই সময়ে চন্দননগরে থাকতেন ফরাসি শিক্ষাবিদ ও গবেষক পি সি কডিয়ার (P. C. Cordier)। তিনি নিয়মিত তৎকালীন বাংলা ও ভারতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়ে ফিল্ড-ওয়ার্ক ও গবেষণা করতেন।
গবেষণা চলাকালীন কডিয়ার জানতে পারেন, নদীয়া জেলার ফুলিয়া গ্রামে কৃত্তিবাসী রামায়ণের মূল হাতে লেখা পুঁথিটি রক্ষিত রয়েছে। ১৭৭৬ সালে তিনি চন্দননগর থেকে জলপথে ফুলিয়ায় গিয়ে সেই তুলট কাগজে লেখা দুর্লভ পুঁথিটি সংগ্রহ করেন এবং পরবর্তীতে নিজ দেশ ফ্রান্সে পাঠিয়ে দেন। সেই থেকে দীর্ঘ প্রায় ২৫০ বছর ধরে পুঁথিটি ফ্রান্সেই রয়ে গিয়েছে।
[কৃত্তিবাসী রামায়ণের পুঁথির ঐতিহাসিক গতিপথ]
* ১৭৭৬ সাল: ফরাসি পণ্ডিত পি সি কডিয়ার কর্তৃক ফুলিয়া থেকে পুঁথি সংগ্রহ।
* চন্দননগর থেকে প্যারিস: নদীপথে পুঁথি নিয়ে গিয়ে ফ্রান্সের জাতীয় গ্রন্থাগারে সংরক্ষণ।
* ১৯৯৬ সাল: দীর্ঘ চিঠিপত্র বিনিময়ের পর ফ্রান্স থেকে ভারতে আসে পুঁথির 'মাইক্রো ফিল্ম'।
১৯৯৬ সালে এসেছিল ‘মাইক্রো ফিল্ম’, অধরাই থেকে যায় আসল পাণ্ডুলিপি
কৃত্তিবাস স্মৃতি গ্রন্থাগারের প্রাক্তন গ্রন্থাগারিক ও বিশিষ্ট রামায়ণ গবেষক কেশব চক্রবর্তী জানান, ১৯৯৪-৯৫ সালে তৎকালীন কেন্দ্রীয় বিদেশ মন্ত্রক ও কলকাতার জাতীয় গ্রন্থাগারের সহায়তায় প্যারিসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।
এরই প্রেক্ষিতে ১৯৯৬ সালে ফ্রান্স সরকার মূল পুঁথিটি ফেরত না দিয়ে তার একটি প্রযুক্তিগত ‘মাইক্রো ফিল্ম’ সংস্করণ ভারতে পাঠায়। সেই মাইক্রো ফিল্ম বর্তমানে কলকাতার জাতীয় গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত এবং তার একটি ফটোকপি রয়েছে ফুলিয়ার কৃত্তিবাস স্মৃতি গ্রন্থাগারে। তবে গবেষকদের আক্ষেপ— ডিজিটাল কপি থাকলেও স্পর্শযোগ্য মূল ঐতিহাসিক কৃতিটি আজও পরবাসে।
‘জ্ঞান ভারতম মিশন’ ও পুঁথি গবেষকদের জোরালো দাবি
সম্প্রতি ভারত সরকার ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার যৌথভাবে ‘জ্ঞান ভারতম মিশন’ (Gyan Bharatam Mission)-এর মাধ্যমে শতাব্দী প্রাচীন হস্তলিখিত পুঁথি ও পাণ্ডুলিপি আধুনিক প্রযুক্তিতে সংরক্ষণের বিশেষ কাজ শুরু করেছে। বাংলার প্রতিটি জেলার জেলাশাসকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে প্রাচীন পুঁথি খুঁজে বের করার জন্য।
বাঁকুড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট পুঁথি বিশেষজ্ঞ ও অধ্যাপক অরবিন্দ চট্টোপাধ্যায় বলেন—
“বাংলা রামায়ণের অজস্র প্রতিলিপি দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে থাকলেও ফ্রান্সে থাকা পুঁথিটি ঐতিহাসিক গবেষণার খাতিরে অত্যন্ত অমূল্য। এটি দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলে মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্য ও ভাষার বহু অজানা দিগন্ত উন্মোচিত হবে।”
একই সুর শান্তিপুরের বিজেপি বিধায়ক স্বপনকুমার দাস-এর কণ্ঠেও। তিনি জানান, দেশের ও রাজ্যের কোটি কোটি মানুষের আবেগ জড়িয়ে রয়েছে এই রামায়ণের সাথে। কেন্দ্রীয় সংষ্কৃতি মন্ত্রক ও পররাষ্ট্র মন্ত্রকের মাধ্যমে ফ্রান্স সরকারের সাথে কথা বলে মূল পুঁথিটি অবিলম্বে ভারতে ফিরিয়ে আনার আইনি ও কূটনৈতিক প্রয়াস চালানো উচিত।
এক নজরে কৃত্তিবাসী রামায়ণের মূল পুঁথি সংক্রান্ত তথ্য:
| বিষয় | বিবরণ |
| রচয়িতা ও জন্মস্থান | কৃত্তিবাস ওঝা, ফুলিয়া (নদীয়া, পশ্চিমবঙ্গ) |
| পুঁথি সংগ্রহের বছর | ১৭৭৬ সাল |
| সংগ্রাহক | পি সি কডিয়ার (ফরাসি শিক্ষাবিদ) |
| বর্তমান অবস্থান | ফ্রান্সের জাতীয় গ্রন্থাগার (National Library of France) |
| ভারতে রক্ষিত সংস্করণ | জাতীয় গ্রন্থাগারে ‘মাইক্রো ফিল্ম’ এবং ফুলিয়া লাইব্রেরিতে ফটোপ্রিন্ট |
এমবাপে-ম্যাঁক্রোর দেশ ফ্রান্স থেকে কি অবশেষে ভারতে ফিরবে কবি কৃত্তিবাস ওঝার হাতে তৈরি সেই অমর সৃষ্টি? ‘জ্ঞান ভারতম মিশন’-এর আবহে রাম-ভক্ত এবং বাংলা সাহিত্যপ্রেমীরা এখন তাকাচ্ছেন কেন্দ্রীয় পররাষ্ট্র ও সংস্কৃতি মন্ত্রকের পদক্ষেপের দিকে।






